পৌরাণিক আখ্যান অনুযায়ী, শ্রীকৃষ্ণ ও শ্রীরাধার বিবাহ সংঘটিত হয়েছিল উত্তর প্রদেশের মথুরার নিকটবর্তী ভাণ্ডীরবনের এক বিশাল বটবৃক্ষের তলায়। এই স্থান আজও ‘রাধা-কৃষ্ণ বিবাহ স্থান’ নামে খ্যাত। শাস্ত্রসম্মত বর্ণনায় বলা হয়েছে, স্বয়ং ব্রহ্মাই ছিলেন সেই ঐশ্বরিক বিবাহের পুরোহিত।
ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণ-এর কৃষ্ণজন্মখণ্ড (১৫.১২৪–১৩৬) এবং গর্গ সংহিতা-র গোলোকখণ্ড (১৬.৩০-৩৪)-এ এই বিবাহের বিশদ বিবরণ পাওয়া যায়। সেখানে বলা হয়েছে, ব্রহ্মা অগ্নি প্রজ্বলন করে বৈদিক মন্ত্রোচ্চারণে হোম সম্পন্ন করেন, রাধা-কৃষ্ণকে সপ্তবার অগ্নি প্রদক্ষিণ করান, পাণিগ্রহণ ও মালাবদল করান। দেবগণের দুন্দুভি, পারিজাত-পুষ্পবৃষ্টি ও অপ্সরাদের নৃত্যে মুখরিত হয়ে ওঠে পরিবেশ। আখ্যানটি কেবল একটি লোককথা নয়, বরং বৈদিক বিধি অনুসারে সম্পন্ন এক দিবারাত্রির লীলারূপে উপস্থাপিত।
এখানেই উঠে আসে বিতর্কের প্রসঙ্গ। জনপ্রিয় লোককথায় রাধাকে কখনও ‘রায়াণ গোপের পত্নী’ বলা হলেও, ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণ-এ স্পষ্ট শ্লোক রয়েছে, “মূঢ়া রায়াণপত্নী ত্বাং বক্ষ্যন্তি জগতীতলে”-অর্থাৎ, ‘ভূতলে যারা মূঢ়, তারাই রাধিকাকে রায়াণের পত্নী বলে।’ আরও একটি শ্লোকে বলা হয়েছে, “স্বয়ং রাধা কৃষ্ণপত্নী কৃষ্ণবক্ষঃস্থলস্থিতা”-রাধা স্বয়ং কৃষ্ণের পত্নীরূপে তাঁর হৃদয়পদ্মে চিরনিবাসিনী।
ভাণ্ডীরবন মন্দিরে আজও যে মূর্তি দেখা যায়... কৃষ্ণ রাধার সিঁদুরদান করছেন... তা এই পুরাণোক্ত বিবাহ-লীলা স্মরণ করায়। ফলে, রাধা–কৃষ্ণের সম্পর্ক কেবল প্রেমিক-প্রেমিকা কিম্বা গোপ-গোপিনীর সম্পর্কে সীমাবদ্ধ নেই; শাস্ত্রসমর্থিত দাম্পত্য-লীলারও এক গভীর আধ্যাত্মিক প্রতিচ্ছবি।
এই আখ্যান ভক্তিমার্গে এক গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দেয়... রাধা কেবল প্রেমিকা নন, তিনি কৃষ্ণের প্রাণাধিষ্ঠাত্রী শক্তি; আর তাঁদের মিলন মানবাত্মা ও পরমাত্মার চিরঐক্যের রূপক।