ফাল্গুনের পূর্ণিমা মানেই দোল। বাংলায় 'খোল দ্বার খোল, লাগলো যে দোল' আর হিন্দিতে 'বালাম পিচকারি'- এই সুরের ভেতর দিয়েই শুরু হয় বসন্তের রঙিন উৎসব। কিন্তু হোলির আসল রূপ যদি কোথাও সবচেয়ে জীবন্ত হয়ে ওঠে, তবে তা রাধা-কৃষ্ণের লীলাভূমি মথুরা ও বৃন্দাবন-এ। এখানে হোলি শুধু রং খেলা নয়, এটি প্রেম, পুরাণ, লোকাচার ও ভক্তির এক মহামিলন।
মথুরা: উত্তরপ্রদেশের এই প্রাচীন শহর শ্রীকৃষ্ণের জন্মস্থান হিসেবে হিন্দুদের কাছে পরম পবিত্র। মউজপুর, মধুপুরী, মধুবন- নানা নাম পেরিয়ে আজকের মথুরা ইতিহাস ও আধ্যাত্মিকতার এক অনন্য কেন্দ্র। এমনও প্রচলিত আছে যে সম্রাট অশোক এখানে এসে বৌদ্ধধর্মে দীক্ষা নিয়েছিলেন।
তবে হোলির সময় মথুরার রূপ সম্পূর্ণ অন্যরকম। প্রায় এক সপ্তাহ ধরে চলে উৎসব। ‘ব্রজ কি হোলি’, ‘লাঠমার হোলি’, ‘লাড্ডু হোলি’- প্রতিটি পর্বেই রয়েছে ভিন্ন স্বাদ, ভিন্ন আবেগ। দেশ-বিদেশ থেকে হাজার হাজার মানুষ ভিড় জমান এই রঙের আনন্দ উপভোগ করতে।
লাঠমার হোলি: মথুরা থেকে প্রায় ৪২ কিলোমিটার দূরের বারসানা গ্রামে পালিত লাঠমার হোলি বিশ্বখ্যাত। কথিত আছে, শৈশবে কৃষ্ণ তাঁর মা যশোদাকে জিজ্ঞেস করেছিলেন কেন রাধার গায়ের রং উজ্জ্বল আর তাঁর শ্যামবর্ণ। মা মজা করে বলেছিলেন, রাধাকে রং মেখে দাও। সেই স্মৃতিরই প্রতিফলন আজকের লাঠমার হোলি।
এখানে পুরুষেরা গোপের বেশে এসে নারীদের রং মাখাতে গেলে, নারীরা লাঠি হাতে তাদের তাড়া করেন। পুরুষেরা ঢাল দিয়ে আত্মরক্ষা করেন। হাসি-ঠাট্টা, লোকগান আর রঙের উচ্ছ্বাসে গোটা গ্রাম মুখর হয়ে ওঠে। পরদিন ‘বদলা’ পর্বে আবার পুরুষেরা রং মেখে আগের দিনের প্রতিশোধ নেন- সবটাই আনন্দ আর ঐতিহ্যের আবহে।
বারসানার রাধারানী মন্দির-এ পালিত হয় লাড্ডু হোলি। হাজার হাজার লাড্ডু আর আবির একসঙ্গে ছুঁড়ে দেওয়া হয় ভক্তদের দিকে। দর্শনার্থীরা সেই লাড্ডু কুড়িয়ে আবার একে অন্যকে ছুঁড়ে দেন- মিষ্টির সঙ্গে মিশে যায় রঙের আনন্দ।
মথুরার দ্বারকাধীশ মন্দির-এ ফুলের হোলি বিশেষ আকর্ষণ। ১৮১৪ সালে নির্মিত এই মন্দিরে দোল ও জন্মাষ্টমী জাঁকজমকপূর্ণভাবে পালিত হয়। এছাড়া মদনমোহন মন্দির-এও দোলের সময়ে বিশেষ ভক্তিসঙ্গীত ও আবিরখেলার আয়োজন থাকে।
মথুরা থেকে মাত্র ১৫ কিলোমিটার দূরে যমুনাতীরে বৃন্দাবন। ‘বৃন্দা’ (তুলসী) ও ‘বন’ (অরণ্য) শব্দের মিলনে নামের উৎপত্তি। নিধুবন ও সেবাকুঞ্জ আজও রাধাকৃষ্ণের লীলার স্মৃতি বহন করে।
হোলির সময় বৃন্দাবনের প্রতিটি গলি রঙিন হয়ে ওঠে। আবিরভর্তি প্যাকেট হাতে ভক্তরা 'রাধে রাধে' ধ্বনি দিতে দিতে রং খেলেন। বিশেষ করে বাঁকে বিহারী মন্দির চত্বরে বিদেশি পর্যটকদের ঢল নামে। মন্দিরের ভেতরে কৃষ্ণমূর্তিকে ঘিরে চলে আবিরখেলা ও কীর্তন।
মথুরা-বৃন্দাবনের হোলি প্রমাণ করে- প্রেম, ভক্তি ও সংস্কৃতি মিলেই উৎসবকে করে তোলে অনন্ত। একবার এই রঙের রাজ্যে গেলে বুঝবেন, কেন বসন্ত এলে মন নিজেই বলে ওঠে- 'রাধে রাধে'।