বরাহনগর। গঙ্গা তীরবর্তী আদিম জনপদ। শ্রীরামকৃষ্ণ ঠাকুরের পদধূলি ধন্য এ মাটি। জীবনের বড়ো অংশ কাটিয়েছেন এখানে উদ্যানবাটীতে। নিয়মিত চপ খেতেন বাজার মোড়ের একটি দোকানে। কিন্তু এ গল্পের শুরু অন্য কোনো খানে। শহরের উত্তর প্রান্ত বরাবর চলে গেছে বিটি রোড। পৌঁছেছে ব্যারাকপুর। মনোহর ঘোষ একসময় বসবাস করতেন সেখানেই। রাজা টোডরমলের গোমস্তা। পরবর্তীতে হন মুহুরী। মোঘল পাঠানদের সাথে যুদ্ধে সবকিছু খুইয়ে একসময় বসতি স্থাপন চিৎপুরে। সেখানেই প্রতিষ্ঠিত হন দেবী চিত্তেশ্বরী। কাশীপুরে। ঠাকুরের কল্পতরু ভিটে থেকে হাঁটা পথে মিনিট দশেক। গান-অ্যান্ড-সেল ফ্যাক্টরির কাছেই। দেবীর রূপ এখানে খানিক ভিন্ন। সিংহবাহিনী দুর্গামূর্তি। বাকি অন্যান্য সন্তানসন্ততি এখানে অনুপস্থিত। পাশে অধিষ্ঠিত একটি বাঘ। শোনা যায় এই ব্যাঘ্রদেবতা নাকি আদতে দক্ষিণরায়। এ থেকে এও পরিচয় পাওয়া যায় যে এই অঞ্চল একসময় ঘন জঙ্গলাকীর্ণ ছিল। বাঘের উৎপাতও ছিল তীব্র। আর ছিল ঘন জঙ্গলে ডাকাতদের উৎপাত। কথিত আছে এই ডাকাতদের অত্যাচারেই মনোহর ঘোষ একসময় বিতাড়িত হন নিজভূমে। অন্যত্র যাত্রা করেন।
সেই সময় সে অঞ্চলে খ্যাতনামা ডাকাত ছিলেন চিতে ডাকাত। কালীভক্ত। আর কলকাতা তখনও শিকড়বাকড়ের মত ছড়িয়ে পড়েনি বর্ধিষ্ণু হয়ে। কাশীপুর প্রত্যন্ত অঞ্চল। ধীবর-মৎসজীবি সম্প্রদায় অধিক পরিমানে বিদ্যমান। বাঘের আক্রমণ নিয়মিত। বিশেষজ্ঞরা মনে করে, হয়ত সেই কারণেই চিত্তেশ্বরী মন্দিরে দক্ষিণ রায়ের মূর্তি আজও রয়েছে। দেবতাজ্ঞানে পূজিত হতেন বাঘ। আর চিতে ডাকাত ছিলেন এই দেবীর ভক্ত। সেই থেকেই আজকের চিত্তেশ্বরী মন্দির। সামনের রাস্তাও বহন করছে সেই সাবেকিয়ানা, চিৎপুর রোড। পরবর্তীতে এই মন্দিরের দায়িত্বভার পান সাবর্ণরায় চৌধুরীরা। তাঁদেরই বংশধর, কাশীশ্বর রায়চৌধুরী আজকের সেবায়েত। শোনা যায় একসময় নরবলিও হয়েছে দেবীকে উৎসর্গ করে। পরবর্তীতে শুরু হয় ছাগবলি। এখন শুধু ফলবলিটুকুই হয়। যদিও সেই পুরোনো হাঁড়িকাঠ আজও রয়েছে। একসময় পায়ে হেঁটে যাতায়াত করতেন ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণদেবও। সন্ধ্যা নামে, গঙ্গার দিকেও উড়ে যায় বন্য পাখির ঝাঁক। প্রাচীন ইতিহাস সঙ্গী হয়ে বুড়ো অশ্বত্থর মতো বেঁচে থাকে মহানগরী তিলোত্তমা।