ভারতীয় সনাতন ধর্মের শাস্ত্রে বিভিন্ন দেব দেবীদের এক একজন বাহনের উল্লেখ পাওয়া যায়। দেবতাদের এই বাহন থাকার কারণ কি? তার নেপথ্যে পৌরাণিক ব্যাখ্যাও রয়েছে। তেমনি সিদ্ধিদাতা ভগবান গণেশ ইঁদুরকে কেন বাহন হিসাবে বেছে নিলেন?এই ঘটনার নেপথ্যে পৌরাণিক ব্যাখ্যা কী? আজ জানাব সেই তথ্য।
পৌরাণিক কাহিনি অনুসারে, স্বর্গের উপদেবতা অর্থাৎ এক গন্ধর্ব দেবতাদের অভিশাপে গজমুখ আকৃতির অসুর রূপে মর্ত্যে জন্ম গ্রহণ করেন। এই অভিশাপের বদলা নিতে গজমুখাসুর শিবের কঠোর তপস্যা শুরু করেন। গজমুখাসুর অত্যন্ত কঠোর তপস্যা করে ভগবান শিবকে সন্তুষ্ট করেছিলেন। শিবের কাছ থেকে সে বর লাভ করে যে—কোনো দেবতা,মানুষ,পশু তাকে বধ করতে পারবে না। এমন কি কোনো অস্ত্র দিয়েও তাকে হত্যা করা যাবে না। এই শক্তিশালী বরের কারণে সে নিজেকে অমর ও অপরাজেয় মনে করতে শুরু করে।
বর পাওয়ার পর গজমুখাসুরের অহংকার চরম সীমায় পৌঁছায়। সে স্বর্গ, মর্ত্য ও পাতাল— জয় করে নিজের রাজত্ব কায়েম করে এবং দেব-ঋষিদের ওপর অমানুষিক নির্যাতন শুরু করে। সে দেবতাদের বন্দি করে দিনে ও রাতে খুব অত্যাচার করত লাগল। অসুরের অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে দেবতারা ও ঋষিরা ভগবান শিবের শরণাপন্ন হন এবং এই সংকট থেকে মুক্তির প্রার্থনা করেন। শিব খুব চিন্তিত হয়ে পড়লেন। গজমুখাসুরকে দেওয়া শিবের বরের কিছু ফাঁক খোঁজার চেষ্টা করলেন, যা সাধারণ দেবতাদের পক্ষে ধরা সম্ভব ছিল না। তাই শিব এই কাজের জন্য তাঁর পুত্র বিঘ্নহার্তা গণেশকে নিযুক্ত করলেন,গজমুখাসুরকে বধ করার কৌশল বলে দিলেন।
ভগবান গণেশ যখন গজমুখাসুরের সাথে যুদ্ধে লিপ্ত হন, তখন অসুরের মায়াবী ক্ষমতার কারণে সাধারণ কোনো অস্ত্র তাকে কাবু করতে পারছিল না। তখন গণেশ শিবের দেওয়া কৌশল মনে করে তাঁর নিজের একটি দাঁত ভেঙে সেটিকেই মোক্ষম অস্ত্র হিসেবে গজমুখাসুরের দিকে নিক্ষেপ করেন। গণেশের এই অলৌকিক অস্ত্রের প্রচণ্ড আঘাতে গজমুখাসুর পরাস্ত হয়। মৃত্যুর মুখে দাঁড়িয়ে সে নিজের রূপ বদল করে বিশাল ইঁদুরের রূপ ধারণ করে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে। গণেশ তখন তাকে পাশ বা দড়ির ফাঁসে আটক করে। গণেশ তখন ইঁদুরটিকে বধ না করে তার অহংকার চূর্ণ করতে নিজের বাহন হতে বাধ্য় করেন। এক কথায়, অহংকার দমন, দেবতাদের দাসত্ব থেকে মুক্তি এবং মহাবিশ্বে ধর্মের পুনঃপ্রতিষ্ঠার জন্যই গণেশ গজমুখাসুরকে বাহন করেছিলেন।
ইঁদুর বা মুষিক ছোট হলেও সব জায়গায় ঢুকে সবকিছু কেটে নষ্ট করতে পারে। তেমনি মানুষের ক্ষুদ্র অহংকার ও লোভ জীবনকে ধ্বংস করে। গণেশের পদতলে ইঁদুরের অবস্থান সেই লোভ ও অহংকার দমনের শিক্ষা দেয়।