মহাভারত কী শুধুই যুদ্ধ, রাজনীতি কিংবা ধর্মের কাহিনি? মানুষের জীবন, মৃত্যু, নৈতিকতার গল্প নয়? না না ব্যক্তির সিদ্ধান্ত ও সিদ্ধান্তহীনতা নিয়েও এই মহাকাব্যে রয়েছে নানা পরত ও পর্যালোচনা। তেমনই একটি জটিল বিষয় আত্মহনন বা স্বেচ্ছায় জীবন শেষ করে দেওয়া। আধুনিক সময়ে যে বিষয়টি মূলত চিকিৎসা, আইন ও মানসিক স্বাস্থ্যের সঙ্গে যুক্ত, প্রাচীন ভারতীয় শাস্ত্রে সেটিকে দেখা হয়েছে ধর্ম, কর্ম এবং পরজন্মের ধারণার সঙ্গে মিলিয়ে। মহাভারতে এমন কিছু ঘটনার উল্লেখ রয়েছে, যেখানে মৃত্যুর ইচ্ছা প্রকাশ করেও মানুষ শেষ পর্যন্ত জীবিত থেকেছেন, খুঁজেছেন বেঁচে থাকার মানে। ঋষি বশিষ্ঠের ঘটনাটি তার অন্যতম উদাহরণ। তাঁর বহু সন্তান নিহত হওয়ার পর গভীর শোকে তিনি নিজের জীবনে দাড়ি টানার সিদ্ধান্ত নেন। একবার লতাপাতা দিয়ে হাত-পা বেঁধে প্রবল স্রোতের বিপরীতে উত্তাল নদীগর্ভে ঝাঁপ দেন। কিন্তু নদীর ইচ্ছা ছিল ভিন্ন, জল তাঁর বাঁধন খুলে দিয়ে তাঁকে নিরাপদে তীরে পৌঁছতে সাহায্য করে। সেই নদীর নামকরণ তিনি করেন ‘বিপাশা’ অর্থাৎ যে বন্ধন থেকে মুক্তি দেয়। আর একবার বশিষ্ঠ ঝাঁপ দিয়েছিলেন পাহাড়ি নদীতে, নদী তাঁকে গ্রহণ না করে তীরে তুলে দেয়। পরে সেই নদীর নাম হয় ‘শতদ্রু’। আশ্রমে ফিরে তিনি জানতে পারেন, তাঁর পুত্র শক্ত্রির স্ত্রী নাকি সন্তানসম্ভবা। সেই সন্তানই পরবর্তীকালে পরাশর মুনি হন, যাঁর পুত্র কৃষ্ণদ্বৈপায়ন ব্যাস। অর্থাৎ ব্যাসদেবের বংশের সঙ্গে যুক্ত এই ঘটনাই জীবনের প্রতি প্রবলভাবে ফিরে আসার একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিতবাহী। তবে মহাভারত নির্বিচারে আত্মহননকে কিন্তু সমর্থন করেনি। ক্রোধ, অপমান, অভিমান কিংবা ব্যক্তিগত আবেগের বশে নিজের জীবন শেষ করাকে সেখানে বরাবরই নিন্দিত। পরবর্তী স্মৃতিশাস্ত্র ও পুরাণেও আত্মহননের নানা শ্রেণিবিভাগ লক্ষ্য করা যায়। এমন মৃত্যুর সঙ্গে পরলোক, পাপ-পুণ্য এবং কর্মফলের ধারণা বারবার জুড়ে যায়। শাস্ত্রীয় ব্যাখ্যায় অবশ্য সব ধরনের স্বেচ্ছামৃত্যুকে সমদৃষ্টিতে দেখা হয়নি। নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে দেহত্যাগকে গ্রহণযোগ্য বলেও কিছু মতের উল্লেখ পাওয়া যায়। বিশেষত সংসারের প্রতি সম্পূর্ণ অনাসক্ত, বেদান্তে পারদর্শী কোনও ব্যক্তি যদি হঠাৎ কখনো জীবনের অনিত্যতা উপলব্ধি করে পবিত্র তীর্থস্থানে উপবাসের মাধ্যমে নিয়ম মেনে দেহত্যাগ করেন, তা এক ধরনের স্বীকৃত পথ হিসেবে বর্ণিত রয়েছে। এর উদ্দেশ্য ছিল জীবন থেকে পালানো নয়, বরং আধ্যাত্মিক পথে মুক্তির সন্ধান। শল্যপর্ব এবং অনুশাসনপর্বে এমন স্বেচ্ছামৃত্যুর একাধিক উল্লেখ রয়েছে। পবিত্র তীর্থে উপবাসের মাধ্যমে দেহত্যাগের ক্ষেত্রে শারীরিক কষ্ট বা সাময়িক হতাশাকে কারণ হিসেবে গ্রহণ করা হয়নি। অর্থাৎ ব্যক্তির গভীর আধ্যাত্মিক উপলব্ধিই এখানে মূল।
আর একটি ক্ষেত্রে আবার আত্মহননকে প্রায়শ্চিত্ত হিসেবেও দেখা হয়েছে। গুরুতর পাপের শাস্তি বা প্রায়শ্চিত্তের প্রসঙ্গে প্রাচীন শাস্ত্রে কঠোর আত্মত্যাগের বার্তাও দেওয়া হয়েছে। তবে একই সঙ্গে অন্য ধরনের প্রায়শ্চিত্তের কথাও উল্লিখিত রয়েছে। যেমন গুরুতর অপরাধের ক্ষেত্রে গবাদি পশু, জমি বা সম্পদ দানের মাধ্যমে পাপমোচনের বিধান। ফলে প্রাচীন শাস্ত্রেও এ বিষয়ে একটিমাত্র মত ছিল না।
তৃতীয় ধরনের স্বেচ্ছামৃত্যু আবার খানিক আলাদা। দীর্ঘদিন ধরে এমন কোনও অসুখে ভুগছেন যে ব্যক্তি, যার সেই অর্থে আর কোনও চিকিৎসা নেই এবং যাঁর শারীরিক কষ্ট অসহনীয় হয়ে উঠেছে, এমন ব্যক্তির ক্ষেত্রে দেহত্যাগের ধারণাকে কিছু শাস্ত্রে অনুমোদনের সঙ্গে উল্লেখ করা হয়েছে। একে বলা যায় ‘নিষ্কৃতি মৃত্যু’। যা আজকের যুগে বহু উন্নত দেশে আইন গ্রাহ্য। এখানে লক্ষ্য ধর্মীয় পুণ্য অর্জন নয়, বরং অসহনীয় যন্ত্রণা থেকে মুক্তির পথ বেছে নেওয়া। এই ধারণার সঙ্গে প্রাচীন ভারতীয় চিকিৎসাবিদ্যার সম্পর্কও গুরুত্বপূর্ণ। মহাভারতে চিকিৎসা, রোগীর পরিচর্যা এবং চিকিৎসকের দায়িত্ব প্রসঙ্গে বিভিন্ন মতামত রয়েছে। চরক ও সুশ্রুতের চিকিৎসা-ভাবনায় রোগীর কল্যাণ, ক্ষতিসাধন না করা এবং চিকিৎসকের দায়িত্বের উপর সমূহ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল। অর্থাৎ অসুস্থ মানুষের জীবন রক্ষা এবং তার কষ্ট কমানো, দুটিই তৎকালীন চিকিৎসাব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব ছিল।
আধুনিক চিকিৎসাবিদ্যাতেও রোগীর নিজের সিদ্ধান্ত, রোগীর সর্বোচ্চ মঙ্গল, ক্ষতিসাধন না করা এবং সকলের প্রতি ন্যায়সঙ্গত আচরণ, এই চারটি নীতি কিন্তু বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। সেই জায়গা থেকেই আজকের পৃথিবীতে ‘ইউথানেশিয়া’ বা চিকিৎসাজনিত স্বেচ্ছামৃত্যু আইনসিদ্ধ কিনা তা নিয়ে বিভিন্ন দেশে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। কোন পরিস্থিতিতে একজন অসহনীয় যন্ত্রণায় থাকা রোগী মৃত্যুর সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন, তা নিয়ে দেশভেদে আইনও আলাদা। মহাভারতের মৃত্যুচিন্তায় আবার কর্মফলের ধারণাকেও ব্যাখ্যা করা হয়েছে। মানুষের জন্ম ও মৃত্যুকে সেখানে একটি বৃহত্তর কর্মচক্রের অংশ হিসেবে দেখা হয়। মৃত্যু কোনও বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; পূর্বকর্ম, বর্তমান জীবন এবং ভবিষ্যৎ অস্তিত্ব, সবকিছুর সঙ্গে তার নিবিড় যোগ রয়েছে। এই কারণেই আত্মহনন নিয়েও শাস্ত্রকারদের মধ্যে বিভিন্ন সময় মতবিরোধ তৈরি হয়েছে।
শতাব্দী প্রাচীন মহাকাব্যে মৃত্যুকে কেবল সমাপ্তি হিসেবে দেখা হয়নি। মৃত্যু যেন ইহজীবন ও পরজীবনের মধ্যবর্তী একটি সেতুমাত্র। এই বিশ্বাস থেকেই আত্মহননের ফল নিয়েও নানা সতর্কবাণী দেওয়া রয়েছে। আবার নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে স্বেচ্ছায় দেহত্যাগকে আধ্যাত্মিক সিদ্ধান্ত হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়। ভীষ্মের ঘটনাটি এই প্রসঙ্গে উল্লেখযোগ্য। ইচ্ছামৃত্যুর বর পাওয়া ভীষ্ম কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে অসংখ্য বাণে বিদ্ধ হয়ে মাটিতে পড়েননি; তাঁর শরীর শরশয্যায় শায়িত হয়ে ছিল। তিনি সঙ্গে সঙ্গে প্রাণত্যাগ করেননি। উপযুক্ত সময়ের প্রতীক্ষায় থেকে পরে দেহত্যাগ করেন। তাই তাঁর মৃত্যু সাধারণ আত্মহত্যার সঙ্গে এক সারিতে ব্যাখ্যা করা যায় না। বরং নিজের মৃত্যুর সময় বেছে নেওয়ার ক্ষমতার এক বিশেষ উদাহরণ হিসেবেই মহাভারতে তাঁর কাহিনি উঠে আসে।
মহাকাব্যের শেষ দিকেও স্বেচ্ছায় দেহত্যাগের বেশ কয়েকটি ঘটনার উল্লেখ পাওয়া যায়। ধৃতরাষ্ট্র, গান্ধারী ও কুন্তী অরণ্যে থাকার সময় আগুনের কবলে পড়ে নিহত হন। বিদুরের ক্ষেত্রেও কঠোর তপস্যা ও দেহত্যাগের উল্লেখ পাওয়া যায়। সঞ্জয়ও যোগসাধনার মাধ্যমে দেহত্যাগ করেন, বলে কাহিনিতে বর্ণিত হয়েছে। অর্থাৎ মহাভারতের চোখে মৃত্যু নিয়ে ধারণাটি কখনোই একমাত্রিক নয়। আবেগবিহ্বল চিত্তে নিজের জীবন শেষ করা আর দীর্ঘ সাধনা দুই পৃথক জিনিস, অনিবার্য শারীরিক যন্ত্রণা কিংবা নির্দিষ্ট ধর্মীয় বিশ্বাসের ভিত্তিতে দেহত্যাগ সম্পূর্ণ দুটি ভিন্ন বিষয়। প্রাচীন ভারতীয় চিন্তায় এই পার্থক্য করার চেষ্টা সুস্পষ্ট। তবে আধুনিক সমাজে আত্মহত্যার বিষয়টি সম্পূর্ণ ভিন্ন বাস্তবতার মধ্যে বিচার্য। মানসিক যন্ত্রণা, একাকীত্ব, অসুস্থতা, সামাজিক চাপ কিংবা নানা ব্যক্তিগত সংকট মানুষকে এমন সিদ্ধান্তের দিকে ঠেলে দিতে পারে। তাই প্রাচীন শাস্ত্রে স্বেচ্ছামৃত্যু নিয়ে যে আলোচনা রয়েছে, তাকে সরাসরি আধুনিক আত্মহত্যার সঙ্গে মিলিয়ে দেখা কখনোই উচিত নয়। মহাভারতের এই কাহিনিগুলি বরং দেখায়, হাজার বছর আগেও মানুষ জীবন ও মৃত্যুর অধিকার, যন্ত্রণা, ধর্ম এবং মুক্তি নিয়ে বারবার প্রশ্ন তুলেছিল ও দৃষ্টান্ত রেখেছিল।