বারাসাতের দক্ষিণ পাড়া। আজকে ব্যস্ত বৃহত্তর শহরতলির অংশ। তবে একদা জুড়েছিল ইতিহাস। তাও আবার বনেদি বাড়ির দুর্গাপুজোর সঙ্গে। মিশে রয়েছে মুঘল আমল, রাজপুত রাজপরিবার, বাংলার জমিদারি ইতিহাস এবং স্বাধীনতার লড়াইয়ের নানা অধ্যায়। স্থানীয় ভাবে এই অঞ্চলে পুজো ‘যোধাবাইয়ের পুজো’ নামেই এলাকায় বেশি পরিচিত। তবে পরিবারের নথিতে উল্লেখ রয়েছে এর নাম ‘শিবের কোঠার দুর্গা’। কয়েকশো বছর ধরে চলে আসা এই পুজোর সঙ্গে জড়িত রয়েছে যশোরের রাজা প্রতাপাদিত্যের সেনাধ্যক্ষ শঙ্কর চট্টোপাধ্যায়ের নাম। ইতিহাসের প্রচলিত কাহিনি অনুযায়ী, যশোরের রাজা প্রতাপাদিত্য ছিলেন বাংলার বারো ভূঁইয়াদের মধ্যে একজন। তাঁর রাজধানী ছিল ধূমঘাট অঞ্চলে। মুঘল সম্রাট আকবরের সময় থেকেই তাঁর সঙ্গে দিল্লির শাসকদের বিরোধ তৈরি হতে শুরু করে। পরে সম্রাট জাহাঙ্গীরের আমলে প্রতাপাদিত্যকে পরাস্ত করার চেষ্টা আরও জোরদারভাবে শুরু হয়। সেই সময় তাঁর অন্যতম বিশ্বস্ত সেনাপতির পদে আসীন ছিলেন শঙ্কর চট্টোপাধ্যায়।
মুঘলদের তরফে নানা ভাবে শঙ্করকে নিজেদের দিকে টানার প্রচেষ্টা হয়েছিল বলে কথিত আছে। কিন্তু তিনি প্রতাপাদিত্যের সঙ্গ কখনো ছাড়েননি। শেষ পর্যন্ত অম্বরের রাজা মান সিংহের নেতৃত্বে মুঘল বাহিনীর সঙ্গে যুদ্ধে পরাজিত হন প্রতাপাদিত্য ও সেনাপতি শঙ্কর। তৎক্ষণাৎ তাঁদের বন্দি করা হয়। যশোরেশ্বরী দেবীর মূর্তিও নিয়ে যাওয়া হয় অম্বরে। আজও সেখানে সেই দেবীর আরাধনা হয় বলে প্রচলিত আছে। প্রতাপাদিত্যের মৃত্যু হয় বন্দিদশার মধ্যেই। শঙ্করের ভাগ্যে জোটে দীর্ঘ কারাবাস। পরে রাজমাতা যোধাবাইয়ের হস্তক্ষেপে তাঁর মুক্তি মেলে। তাঁকে পূর্বপুরুষের ভিটের কাছাকাছি জমি দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়। সেখানেই ফিরে এসে তিনি নতুন করে নিজের জীবন শুরু করেন। শঙ্কর ছিলেন শিবের উপাসক। ফলে নিজের উদ্যোগে দুর্গাপুজো শুরু করার বিষয়ে তাঁর কখনোই তেমন আগ্রহ ছিল না। প্রচলিত কাহিনি বলছে, যোধাবাইয়ের অনুরোধেই তিনি শুরু করেন দেবীর আরাধনা। তাঁর নাম স্মরণ করে পুজোর সংকল্পও করা হত। সেই থেকেই পুজোর সঙ্গে যোধাবাইয়ের নাম অঙ্গাঙ্গিভাবেই জুড়ে যায়।
সময় বদলেছে, পরিবারও ছড়িয়ে পড়েছে বিভিন্ন জায়গায়। বারাসাতে চট্টোপাধ্যায় পরিবারের এক শাখা এখনও পুরনো নিয়ম মেনে রীতি রেওয়াজ অনুসারে পুজো চালিয়ে যাচ্ছে। যদিও বর্তমানে যোধাবাইয়ের নামে সংকল্প করার সেই প্রাচীন রীতির প্রচলন নেই। পরিবারের আর একটি শাখা পুরুলিয়ায় গিয়ে বসতি গড়েছিল। নীলকণ্ঠ চট্টোপাধ্যায়ের হাত ধরে সেখানে শুরু হয় দুর্গাপুজো। নীলকণ্ঠ ছিলেন বিশিষ্ট আইনজীবী এবং পুরুলিয়া পৌরসভার প্রথম চেয়ারম্যান। ‘নীলকণ্ঠ নিবাস’-এর সেই পুজো আজও চলছে। পরিবারের বর্তমান উত্তরসূরি রাজর্ষি চট্টোপাধ্যায় পুজোর দায়িত্ব সামলাচ্ছেন এখন। এই বাড়িতে একবার মহাষ্টমীর দিন নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু এসেছিলেন বলেও স্থানীয়দের মধ্যে প্রচলিত আছে। চট্টোপাধ্যায় পরিবারের সঙ্গে বর্ধমানের অমরার গড়েরও যোগাযোগ ছিল একসময়। প্রায় দুই শতাব্দী পূর্বে পরিবারটি সেখান থেকে পুরুলিয়ায় চলে আসে। সম্পত্তি দেবত্ত করে দেওয়া হলেও পুরনো দুর্গাপুজো আজও বন্ধ হয়নি। স্থানীয় মুখোপাধ্যায় পরিবার এখনও সেই রীতি নিজ দায়িত্বে ধরে রেখেছে। একটি দুর্গাপুজো কী ভাবে রাজনীতি, বন্দিদশা, ধর্মীয় বিশ্বাস, পারিবারিক ঐতিহ্য এবং ইতিহাসের নানা বাঁক পেরিয়ে আজও টিকে থাকতে পারে, বারাসাত ও পুরুলিয়ার চট্টোপাধ্যায় পরিবারের পুজো তারই এক অনন্য উদাহরণ হয়ে জেগে রয়েছে বঙ্গ মানচিত্রে।