Calcutta Television Network

স্বাধীনতার ইতিহাস বুকে নিয়ে দেবীর আরাধনা, হাটখোলা দত্তবাড়ির পুজোয় অন্য আবহ

স্বাধীনতার ইতিহাস বুকে নিয়ে দেবীর আরাধনা, হাটখোলা দত্তবাড়ির পুজোয় অন্য আবহ
15 September 2026 05:33:48 pm

কলকাতার বনেদি বাড়ির দুর্গাপুজো। আদিকালের পুরোনো ঐতিহ্য। যে তালিকার ঝেড়েপুঁছে হিসাব করলে হাটখোলা দত্তবাড়ির পুজোর নাম প্রথম সারিতেই আশা উচিত। উত্তর কলকাতার নিমতলা ঘাট স্ট্রিটের প্রায় আড়াইশো বছরের পুরনো পুজো। এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে পারিবারিক ইতিহাসের পাশাপাশি বাংলার সমাজদর্পণ এবং স্বাধীনতা আন্দোলনের নানা স্মৃতিমেদুরতা। এই পুজোর শুরু ১৭৯৪ সালে। উদ্যোক্তা ছিলেন জগৎরাম দত্ত। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির পাটনা শাখায় দেওয়ানের দায়িত্বে থাকা জগৎরাম ছিলেন আন্দুলের দত্তচৌধুরী পরিবারের বংশধর। নিমতলা ঘাট স্ট্রিটে নিজের বাড়ি তৈরি করার পর সেখানেই তিনি প্রচলন করেন দুর্গাপুজোর। দত্তবাড়ির প্রতিমাতেও রয়েছে বেশ কিছু পুরনো রীতির ছাপ। দেবীকে পরানো হয় ডাকের গহনা। প্রতিমার পিছনের চালচিত্রে মঠচৌড়ি ধারার নিখুঁত কারুকার্য লক্ষ্য করা যায়। সেখানে কৃষ্ণের নানা কাহিনি এবং চণ্ডীর আখ্যান দিব্যি ফুটে ওঠে শিল্পীর কল্পনায়। এখানকার সিংহও অন্য অনেক দুর্গাপ্রতিমার তুলনায় আলাদা। ঘোড়ার মতো শরীর, সঙ্গে তার মুখ খানিক ড্রাগনের আদলে তৈরি।

বৈষ্ণব পরিবার হওয়ায় এই বাড়ির পুজোয় কখনো পশুবলি হয় না। অষ্টমীর দিন ক্ষীর দিয়ে তৈরি পুতুল বলি দেওয়ার প্রথা রয়েছে। সেটি কাপড় দিয়ে ঢেকে রাখা হয়। এই পুজোয় অন্ন ভোগও নিবেদন করা হয় না। বদলে থাকে বিভিন্ন মিষ্টান্ন ও ভাজা পদ। ঘিয়ে ভাজা লুচি এবং চিনিগুঁড়ো এই ভোগের বহুল পরিচিত উপকরণ। পুজোর যাবতীয় আচার-অনুষ্ঠান সম্পন্ন করেন ব্রাহ্মণরাই। আর একটি বিশেষ রীতি হল, দশমীর বদলে মহাষ্টমীর দিন এই বাড়িতে সিঁদুর খেলা হয়। শুধু ধর্মীয় রীতি নয়, হাটখোলা দত্তবাড়ির পুজোর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে স্বাধীনতা আন্দোলনের পুরোনো স্মৃতিও। স্বদেশি আন্দোলনের সময়ে এই পরিবারে দুর্গাপুজোকে দেশমাতৃকার ভাবনার সঙ্গে সংযুক্ত করা হয়েছিল বলে কথিত আছে। সেই সময় স্বাধীনতা সংগ্রামীদের নিয়মিত আনাগোনাও ছিল এই বাড়িতে। এমনকি গোপনে বৈঠকও বসত এই বাড়িতে।

এই পরিবারের সঙ্গে নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর যোগাযোগের কথাও প্রচলিত আছে। জানা যায়, নেতাজির মা প্রভাবতী দেবী একসময় এই বাড়ির দুর্গাপুজোয় নিয়মিত আসতেন। সেই সূত্রেই দত্ত পরিবারের সঙ্গে বসু বাড়ির ঘনিষ্ঠতার কথা প্রকাশ্যে আসে। বিসর্জনের পরেও রয়েছে একটি বিশেষ ঐতিহ্য। কথিত আছে, পরিবারের এক পূর্বপুরুষ প্রতিমা বিসর্জন দিয়ে ফেরার সময়ে দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের ‘বঙ্গ আমার জননী আমার’ গানটি গেয়েছিলেন। সেই স্মৃতি ধরে আজও প্রতিমা নিরঞ্জনের পর পরিবারের পুরুষ সদস্যরা গঙ্গার ঘাট থেকে গান গাইতে গাইতে বাড়ি ফেরেন। ঠাকুরদালানে ফিরে সমবেত ভাবে গান গাওয়া, একে অপরকে আলিঙ্গন এবং শান্তির জল গ্রহণের মধ্য দিয়ে শেষ হয় পূজাপর্ব। প্রায় আড়াইশো বছর পেরিয়েও তাই হাটখোলা দত্তবাড়ির দুর্গাপুজো শুধু একটি পারিবারিক আচার হয়ে থাকেনি। পুরনো রীতি, পারিবারিক স্মৃতি এবং দেশের স্বাধীনতার ইতিহাস, সব মিলিয়ে উত্তর কলকাতার এই পুজো আজও বহন করে চলেছে সুপ্রাচীন দীর্ঘ ঐতিহ্য।

×
  • CTVN