অসম। পাহাড় ঘেরা সুন্দর সবুজ রাজ্য। ততোধিক সুন্দর তার প্রাকৃতিক বৈচিত্র। হলং, বট, আমলকি ঘেরা সুন্দর হরিৎ সমারোহ। তবু শুকনো পাতার খসখস পেরিয়ে মাঝেমাঝে শোনা যায় ফিসফাঁস। কিছু রহস্য যা আজও আবৃত কোনো অতল গভীরতার চাদরে। তেমনই দিমা হাসাও জেলা, রাজধানী গুয়াহাটি থেকে ৩৩০কিলোমিটার দক্ষিনে অবস্থান। সবুজ শ্যামল বোরাইল পর্বতমালা দ্বারা পরিবেষ্টিত গ্রাম জাটিঙ্গা। শান্ত, নিরিবিলি, স্নিগ্ধ পরিবেশ। জাটিঙ্গা শব্দটির উৎপত্তি একটি নাগা শব্দ, থেকে, যার অর্থ ‘বৃষ্টি ও জলের পথ’। কিন্তু গ্রামটি খ্যাতি পেয়েছে অন্য এক রহস্যের শরিক হয়ে। কিছু অদ্ভুত ঘটনা। সূত্রপাত, নয়ের দশকের শুরুর সময় থেকে। এক শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে, বিজ্ঞানী, পক্ষীবিশারদ ও স্থানীয় জনজাতির আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু এখানকার পক্ষীকূল। রহস্য এতটাই ছড়িয়েছে যে বিদেশ থেকেও বিভিন্ন সময় সমূহ পর্যটক সমাগম ঘটেছে এই অঞ্চলকে ঘিরে। রহস্যের কারণ?
গণহারে পাখির সুইসাইড।
সেপ্টেম্বর থেকে নভেম্বর, বছরের এই পরিসরটুকু প্রবল কুয়াশায় আচ্ছন্ন থাকে এই অঞ্চল। শীত শীত আসার ঠিক আগের সময়। চারিদিকে ধোঁয়া ধোঁয়া পরিবেশ সৃষ্টি হয় গহীন অরণ্য জুড়ে। অদ্ভুতভাবে এইসময় এই অঞ্চলের স্থানীয় পাখিসহ পরিযায়ী পক্ষীদের আচরণে অদ্ভুত কিছু পরিবর্তন পরিলক্ষিত হয়। মাছরাঙা, হর্নবিলসহ বিভিন্ন প্রজাতির পাখি, এমনকি রাতচড়া পাখিদের মধ্যেও এলোমেলোভাবে ওড়ার প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়। যেন মনে হয় কোনো কারণে পাখিগুলি অস্থির হয়ে আছে। উল্টোপাল্টা ডানা ঝাপটাচ্ছে তারা। স্থানীয় মানুষ মনে করেন, কোনো এক অদৃশ্য শক্তির তাড়নায় ছটফট করে তারা। ধাক্কা খায় ইঁট, কাঠ, পাথরের বাড়িতে। গাছের গায়েও ধাক্কা খেয়ে প্রচুর পাখির মৃত্যু ঘটতে দেখা যায়। মূলত এই সমস্ত ঘটনাই ঘটে অমাবস্যার রাতে, যখন কোনো প্রাকৃতিক আলো থাকে না। যেকোনো স্থানে আগুন জ্বললে পাখিগুলি কোনো অজ্ঞাত কারণে তার দিকে প্রবলভাবে ধাবিত হয়। গ্রামটি, অসমের স্থানীয় ভাষায় ‘পাখিদের বারমুডা ট্রায়াঙ্গেল’ উপাধিও পেয়েছে।
নয়ের দশকে নাগা জনগোষ্ঠীই প্রথম এই বিষয়টি লক্ষ্য করে। তখন তাঁদের মধ্যে রটে যায় কোনো অশুভ শক্তি বা উপদেবতার উৎপাতের কথাও। দ্রুত তারা গ্রামটি ছেড়ে অন্যত্র যাত্রা করে। ১৯০৫ নাগাদ জয়ন্তীয়া উপজাতি এই পরিত্যক্ত গ্রামটির সন্ধান পায়, সেখানেই বসবাস শুরু করে। তারা এই পাখি আত্মহত্যার ঘটনাটিকে অভিশাপ হিসাবে না দেখে বেশ কিছুটা উপকার পেয়েছিল। দুর্গম পার্বত্য উপত্যকায় বেঁচে থাকার খাদ্য খুঁজে পেয়েছিল তারা।
যদিও এই পাখি মৃত্যুর ঘটনার কোনো সমাধান আজ অবধি পাওয়া যায়নি। অনেক বিশেষজ্ঞ মনে করেন, গ্রামের ভূপ্রকৃতি এক অদ্ভুত দোলাচল তৈরী করে পাখিদের মধ্যে। ঘন কুয়াশার পাশাপাশি বৃষ্টিপ্রবণ এলাকা হওয়ার কারণে তারা অনেকসময় ধাক্কা খেয়ে থাকতে পারে। এছাড়াও আরেকটি মত, যে এই অঞ্চলে বেশ কিছু পার্বত্য চৌম্বকক্ষেত্র তৈরী হয়েছে, যা থেকে এই ধরণের ঘটনা ঘটে থাকতে পারে। যদিও সঠিক যাচাইকৃত কোনো সমাধান কেউই এখনও পর্যন্ত দিতে পারেনি। তাই পাহাড়ি সৌন্দর্য ও রহস্য মোড়ানো গহীন জঙ্গল সমান্তরালভাবেই বেঁচে আছে অসমের বুকে।