শুনতে অবাক লাগলেও এটা সত্য যে সৃষ্টির আদিতে একাধিক দেবতা তাঁদের নিজের মঙ্গল ও জগৎ রক্ষার্থে বিভিন্ন সময়ে আদ্যাশক্তি মহামায়া মা দুর্গার পূজা করেছিলেন। বিভিন্ন শাস্ত্র ও পুরাণে তার ব্যাখ্যা রয়েছে। পৌরাণিক তথ্য অনুসারে, সৃষ্টির প্রথম যুগে পরমাত্মা ভগবান শ্রীবিষ্ণু অর্থাৎ কৃষ্ণই সর্বপ্রথম দেবী দুর্গার পূজা করেছিলেন। শ্রী কৃষ্ণের পর মধু ও কৈটভ নামে দুই অসুরের ভয়ে ভীত হয়ে সৃষ্টি কর্তা ব্রহ্মা দ্বিতীয় বার দেবী দুর্গার পূজা করেন। ত্রিপুর অসুরের সঙ্গে যুদ্ধ করার সময় সংকটে পড়ে স্বর্গের দেব দেবীদের রক্ষার্থে দেবাদিদেব মহাদেব শিব তৃতীয়বার দুর্গার পূজা করেন। এরপর দুর্বাসা মুনির অভিশাপে শ্রীহীন হয়ে ঐশ্বর্য ফিরে পাওয়ার জন্য দেবরাজ ইন্দ্র দেবী দুর্গার আরাধনা করেছিলেন। আজ জানাব পরমাত্মা ভগবান শ্রীকৃষ্ণ কেন আদিশক্তি মা মহামায়াকে পুজো করেছিলেন,সেই তথ্য।
ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণ অনুসারে, সৃষ্টির প্রারম্ভে বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের স্থিতি, অসুর দমন এবং সৃষ্টির ভারসাম্য রক্ষার জন্য মহাশক্তির আবাহন করতে পরমাত্মা ভগবান শ্রীকৃষ্ণ সর্বপ্রথম দেবী দুর্গার পূজা করেছিলেন। সৃষ্টির আদিতে তিনি বৈকুণ্ঠের আদি-বৃন্দাবনের মহারাসমণ্ডলে শ্রীকৃষ্ণ পরমাত্মা রূপে লীলাচ্ছলে মূলপ্রকৃতি আদিশক্তিকে জাগ্রত ও সন্তুষ্ট করার উদ্দেশ্যে এই পূজার আয়োজন করেছিলেন। পুরাণ ও শাস্ত্রীয় প্রেক্ষাপট অনুযায়ী শ্রীকৃষ্ণের দুর্গাপূজা করার মূল কারণগুলো ছিল-
১) সৃষ্টির শুরুতে মহাবিশ্ব পরিচালনার জন্য এবং ব্রহ্মা, বিষ্ণু ও শিব—এই ত্রিমূর্তির শক্তির উৎস হিসেবে আদিশক্তি মহামায়াকে সক্রিয় করার প্রয়োজন ছিল। শ্রীকৃষ্ণের পূজায় সন্তুষ্ট হয়ে দেবী দুর্গা প্রকট হন এবং সৃষ্টি ও সুরক্ষার দায়িত্ব পালনে দেবতাদের শক্তি প্রদান করেন।
২) সনাতন ধর্মের শাস্ত্রীয় তত্ত্ব অনুযায়ী, শ্রীকৃষ্ণ এবং দেবী দুর্গা মূলত একই পরম সত্যের দুটি রূপ—কৃষ্ণ হলেন পরম পুরুষ বা চৈতন্য এবং দুর্গা হলেন তাঁরই পরম শক্তি বা প্রকৃতি। জড় জগত বা মহাবিশ্ব পরিচালনার ক্ষেত্রে শক্তির গুরুত্ব এবং মর্যাদা প্রতিষ্ঠার জন্য ভগবান নিজে এই লীলা করেছিলেন।
৩) সত্য যুগে পরমাত্মা শ্রীকৃষ্ণ নিজে যেমন দেবীর আরাধনা করেছিলেন,দ্বাপর যুগে তেমনই মহাভারতের কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের আগে তিনি অর্জুনকে দেবী দুর্গার আরাধনা করার নির্দেশ দেন। যুদ্ধের বিজয় নিশ্চিত করতে এবং সমস্ত নেতিবাচক শক্তি বা অসুরিক প্রবৃত্তিকে দমন করে এবং আদ্যাশক্তি দুর্গার আশীর্বাদ লাভ করে বিজেতা হয়ে ধর্মকে রক্ষা করা আবশ্যক ছিল।