১৯৪৫ সালের পরমাণু বিস্ফোরণ। একটা সভ্যতার কালো অধ্যায়। দীর্ঘ সময় পেরিয়েও যে ক্ষত অপূরণীয়।৮০ বছর পর হিরোশিমার মাটিতে মিলল এক অস্বাভাবিক ধরনের সঙ্কর ধাতুর অংশ। ধাতুটির গঠন এতটাই ব্যতিক্রমী যে সাধারণ গবেষণাগারে একই উপাদান তৈরি করা অত্যন্ত কঠিন ও প্রায় অসম্ভব বলে মনে করছেন বিজ্ঞানীদের একাংশ। তাঁদের ধারণা, পরমাণু বোমার বিস্ফোরণের সময় তৈরি হওয়া ভয়াবহ তাপ এবং তার পরেই অত্যন্ত দ্রুত শীতল হয়ে যাওয়ার ফলেই এই পদার্থের জন্ম। ইটালির ফ্লোরেন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানী লুকা বিন্ডির নেতৃত্বে গবেষণার সময় হিরোশিমা বে-র উপকূল থেকে ৩৪টি ধ্বংসাবশেষের নমুনা সংগ্রহ করা হয়। বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর লক্ষ্য করা যায়, অধিকাংশ নমুনাতেই লোহা ও ক্রোমিয়ামের এক অদ্ভুত সংকর উপস্থিত রয়েছে। তবে একটি নমুনার গঠন বিজ্ঞানীদের বিশেষ ভাবে নজর কাড়ে। সেখানে আয়রন, ক্রোমিয়াম, নিকেল, মলিবডেনাম, ম্যাঙ্গানিজ, সিলিকন এবং অ্যালুমিনিয়াম একসাথে রয়েছে।
আরও একটি চমকপ্রদ বিষয় হল, ওই পদার্থের ভিতরে পরমাণুগুলির সাজানো থাকার ধরনও সাধারণ ধাতুর মতো নয়। গবেষকদের মতে, ১৯৪৫ সালের ৬ অগস্ট ‘লিটল বয়’ নামক পারমাণবিক অস্ত্র প্রথমবার বিস্ফোরণের সময় হিরোশিমায় ভয়াবহ তাপ তৈরি হয়েছিল। সেই তাপে বাড়িঘর, মাটি, কাচ, জল এবং বিভিন্ন ধাতু পর্যন্ত গলে বাষ্পে পরিণত হয়েছিল। বিস্ফোরণের পর সেই ধাতব বাষ্প আবার ততোধিক দ্রুত ঠান্ডা হয়ে যায়। স্বাভাবিক অবস্থায় ধাতু ধীরে ধীরে ঠান্ডা হতে থাকলে তার পরমাণুগুলি নির্দিষ্ট কাঠামোয় ফেরত যায়। কিন্তু এত দ্রুত তাপমাত্রা কমে যাওয়ায় সেই সুযোগ হয়নি। ফলে তৈরি হয় ব্যতিক্রমী পরমাণু বিন্যাসের একটি সঙ্কর পদার্থ। এর আগে আমেরিকার নিউ মেক্সিকোয় ১৯৪৫ সালের প্রথম পারমাণবিক প্রয়োগের পরীক্ষার পর তৈরি ‘ট্রিনিটাইট’ নিয়েও বিশদে গবেষণা হয়েছিল। সেই পদার্থে বিশেষ ধরনের এক স্ফটিকের সন্ধান পাওয়া গিয়েছিল। তবে হিরোশিমা থেকে পাওয়া নতুন পদার্থটির গঠন এটির থেকে সম্পূর্ণ আলাদা।
গবেষণাটি প্রকাশিত হয়েছে ‘সায়েন্স অ্যাডভান্সেস’ পত্রিকায়। বিজ্ঞানীদের মতে, এই আবিষ্কার দেখাচ্ছে, অত্যন্ত চরম পরিবেশে মানুষের তৈরি ঘটনাতেও প্রকৃতিতে সাধারণত দৃশ্যমান নয় এমন পদার্থ তৈরি হতে পারে। ভবিষ্যতে অত্যন্ত বেশি তাপ সহ্য করতে পারে এমন নতুন উপাদান তৈরির গবেষণায় এই আবিষ্কার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা গ্রহণ করতে পারে। বিশেষ করে মহাকাশ প্রযুক্তি এবং ভারী শিল্পে এর সম্ভাব্য ব্যবহার নিয়ে গবেষণার অনেক সুযোগ রয়েছে।