প্রাচীন মিশরের রাজপরিবার নিয়ে মানুষের কৌতূহল অসীম। পিরামিড, মমি এবং রাজারাজরাদের নানা কাহিনির গভীরে লুকিয়ে রয়েছে বহু অজানা ইতিহাস। এবার সেই তালিকায় যুক্ত হল মিশরের রাজকন্যাদের যুদ্ধ প্রশিক্ষণের বিষয়টি। মমির হাড় পরীক্ষা করে গবেষকেরা এমন কিছু প্রামান্য নথি পেয়েছেন, যা বিশ্লেষণ করে মনে করা হচ্ছে, কয়েক হাজার বছর আগে রাজপরিবারের মেয়েরাও অস্ত্রচর্চা করতেন নিয়মিত। কায়রোর দক্ষিণে প্রায় ৪০ কিলোমিটার দূরের দাহশুর এলাকা। এখানকার একটি পিরামিডেই প্রায় ১৩০ বছর পূর্বে বেশ কয়েকটি মমির সন্ধান মিলেছিল। প্রত্নতাত্ত্বিক জ্যাক ডি মরগান ১৮৯৫ সালে সেগুলির উদ্ধারকার্যে লিপ্ত হন। পরবর্তীতে ১৯১৫ সালে মমিগুলি কায়রোর তাহরিরের একটি বিশেষ জাদুঘরে নিয়ে যাওয়া হয়। দীর্ঘদিন সেগুলি একটি কাঠের বাক্সে সংরক্ষিত ছিল। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মমিগুলির কথা প্রায় বিস্মৃতই হয়েছিলেন সকলে। ২০২০ সালে বেনি-সুয়েফ বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক জেনাব হাশেশ ফের সন্ধান পান সেই দেহাবশেষের। এরপর শুরু হয় বিস্তারিত পরীক্ষা-নিরীক্ষা। কয়েক বছর ধরে গবেষণা চলার পর তাঁদের কাজ প্রকাশিত হয়েছে ‘ফ্রন্টিয়ার্স ইন এনভায়রনমেন্টাল আর্কিওলজি’ পত্রিকায়। দাহশুরের পিরামিড থেকে পাওয়া মমিগুলির মধ্যে ত্রয়োদশ রাজবংশের রাজা হোরও ছিলেন। চারটি মমি ছিল রাজকন্যাদের। যারমধ্যে ছিলেন নুব-হোটেপ, ইতা, খেনমেত এবং ইতাওয়ারেতের। তাঁদের আমেনেমহাত ২-এর কন্যা বলেই মনে করা হয়।
মমিগুলির পাশে পাওয়া গিয়েছিল তলোয়ার, ধনুক এবং গদার মতো বিভিন্ন অস্ত্রাদি। এত দিন এই অস্ত্রগুলিকে মূলত পরকাল সংক্রান্ত প্রাচীন মিশরীয় বিশ্বাসের সঙ্গেই যুক্ত করা হত। ধারণা ছিল, মৃতদের মৃত্যু পরবর্তী জীবন বা পরকালের জন্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের সঙ্গে অস্ত্রও সংরক্ষণ করে রাখা হয়েছিল। কিন্তু নতুন গবেষণা সেই ধারণাকেই খানিক প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। গবেষকেরা মমিগুলির হাড়ের গঠন খতিয়ে দেখে শরীরচর্চার নানা চিহ্ন পেয়েছেন। বিশেষ করে হাত, কাঁধ এবং শরীরের উপরের অংশের হাড়ে এমন বেশ কিছু পরিবর্তন দেখা গিয়েছে, যা দীর্ঘদিন অস্ত্র ব্যবহার করলে তবেই পরিলক্ষিত হয়। নুব-হোটেপের শরীরে তিরন্দাজদের মতো পেশির বিকাশের প্রমাণ মিলেছে। গবেষকদের মতে, নিয়মিত ধনুকের ছিলা টানার অভ্যাস থেকেই এহেন পরিবর্তন আসতে পারে শরীরে। ইটার ক্ষেত্রেও শরীরের ঊর্ধাংশ বেশ শক্তিশালী ছিল। তাই তাঁর গদা জাতীয় ভারী অস্ত্র ব্যবহারের অভ্যাস ছিল বলেই অনুমান করছেন গবেষককুল। অন্য দিকে, ইতাওয়ারেতের পাঁজর ও পায়ের হাড়ে পুরনো আঘাতের বেশ কিছু চিহ্ন পাওয়া গিয়েছে। অর্থাৎ জীবদ্দশায় তিনি কোনো লড়াইতে গুরুতর চোট পেয়েছিলেন, কিন্তু সেই আঘাতের পরও বেঁচে ছিলেন। তবে রাজকন্যারা সত্যিই যুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন কি না, তা এখনও নিশ্চিত করে বলা যায়নি। গবেষণায় মূলত তাঁদের শারীরিক প্রশিক্ষণ এবং অস্ত্র ব্যবহারের অভ্যাসের কিছু প্রমাণ মিলেছে। গবেষকরা এও মনে করছেন যে, রাজপরিবারের মেয়েদের তিরন্দাজি, শিকার এবং বিভিন্ন ধরনের অস্ত্র চালানোর প্রশিক্ষণ দেওয়াও হয়ে থাকতে পারে। ফলে প্রাচীন মিশরের রাজকন্যাদের সম্পর্কে এত দিন যে ধারণা করা হয়েছিল, তা আরও এক বার বদলানোর সুযোগ তৈরি হয়েছে। রাজপ্রাসাদের আরাম-আয়েশের জীবনে কখনোই তাঁরা সীমাবদ্ধ ছিলেন না। তাঁদের দৈনন্দিন জীবনে শারীরিক প্রশিক্ষণ ও অস্ত্রচর্চারও গুরুত্বপূর্ণ স্থান ছিল, এমনই ইঙ্গিত দিচ্ছে এই গবেষণা।