ডাইনোসর মানেই উষ্ণ আবহাওয়ার প্রাণী, বহুকাল এমনই ধারণা পোষণ করতেন বিজ্ঞানীরা। কারণ, এখনও পর্যন্ত ডাইনোসরের ডিম বা ডিমের খোসার যে জীবাশ্মগুলি পাওয়া গিয়েছে, তার অধিকাংশই নিরক্ষরেখার আশপাশের উষ্ণ অঞ্চলের। কিন্তু দক্ষিণ আর্জেন্টিনার সাম্প্রতিকতম আবিষ্কার সেই ধারণায় বড়সড় পরিবর্তন আনতে চলেছে। গবেষকদের হাতে এসেছে টাইটানোসরের ডিমের জীবাশ্ম, যা প্রায় ৬ কোটি ৮০ লক্ষ বছরের পুরনো। আর সেই ডিমের খোসা মিলেছে দক্ষিণ মেরুর অনতিদূরেই। দক্ষিণ আর্জেন্টিনা থেকে প্রায় ২৫৫টি জীবাশ্ম হয়ে যাওয়া ডিমের খোসার অংশবিশেষ উদ্ধার করেছেন গবেষকেরা। যে এলাকায় সেগুলির সন্ধান পাওয়া গেছে, সেটি দক্ষিণ অক্ষাংশের প্রায় ৫৫ থেকে ৬০ ডিগ্রির ভিতরে।
দক্ষিণ মেরুবৃত্ত শুরু হয়েছে ৬৬.৫ ডিগ্রি অক্ষাংশ থেকে অর্থাৎ আবিষ্কারের জায়গাটি মেরুবৃত্তের একেবারে নিকটেই। এই আবিষ্কারের গুরুত্ব এখানেই যে, এত ঠান্ডা পরিবেশে টাইটানোসরের মতো বিশাল ডাইনোসর শুধু ঘুরে বেড়াত না, সেখানে তারা ডিম পেড়ে বংশবিস্তারও করার প্রয়াস করেছিল বলে মনে করা হচ্ছে। টাইটানোসর ছিল বিশাল আকৃতির একধরণের তৃণভোজী ডাইনোসর। এক একটি প্রাণীর ওজন প্রায় ৭০ টন বা তারও অধিক হতে পারত। অর্থাৎ ওজনের হিসাবে প্রায় দশটি হাতির সমতুল্য। আকারে ভয়ংকর হলেও তারা কখনোই মাংসাশী ছিল না। এত দিন বিজ্ঞানীদের দৃঢ় বিশ্বাস ছিল, শীতল অঞ্চলে ডাইনোসরের পক্ষে ডিম ফুটিয়ে বাচ্চা বের করা কঠিন। ডিমের ভিতরে ভ্রূণের বিকাশের জন্য নিদৃষ্ট তাপমাত্রার প্রয়োজন। তাই উষ্ণ নিরক্ষীয় অঞ্চলেই ডাইনোসররা বেশি করে বাসা তৈরী করত বলেই মনে করা হত। যদিও মঙ্গোলিয়া, আমেরিকার টেক্সাস, দক্ষিণ আর্জেন্টিনা এবং আন্টার্কটিকার মতো দূরবর্তী অঞ্চল থেকেও ইদানিং ডাইনোসরের জীবাশ্ম পাওয়া গিয়েছে, সেখানে তারা নিয়মিত প্রজনন করত কি না, তা নিয়ে নিশ্চিত প্রমাণ যদিও মেলেনি। দক্ষিণ আর্জেন্টিনার এই আবিষ্কার সেই প্রশ্নের গুরুত্বপূর্ণ উত্তর দিতে পারে। কানাডার আলবার্টার ক্যালগেরি বিশ্ববিদ্যালয়ের জীবাশ্মবিদ ডারলা জ়েলেনিতস্কির নেতৃত্বে এই গবেষণাটি চলেছে। গবেষণাপত্রটি প্রকাশিত হয়েছে ‘রয়্যাল সোসাইটি ওপেন সায়েন্স’ নামক পত্রিকায়। গবেষকদের মত, টাইটানোসরেরা নিজেদের ডিমে পাখির মতো তা দিত না কখনোই। বদলে ঠান্ডা পরিবেশে ডিমকে উষ্ণ রাখার জন্য তারা ভিন্ন একটি পদ্ধতি ব্যবহার করত। গাছপালা, মাটি এবং অন্যান্য জৈব উপাদান দিয়ে ঢিবির মতো বাসা নির্মাণ করে তার ভিতরে ডিম পুঁতে রাখত তারা। এই ব্যবস্থায় পচনশীল গাছপালা থেকে বিপুল তাপ তৈরি হত। সেই তাপই সম্ভবত ডিমগুলিকে প্রয়োজনীয় উষ্ণতা দিয়ে বাঁচিয়ে রাখতো। ফলে সূর্যের তাপ কম পাওয়া যায় এমন এলাকাতেও ডিমের ভিতরের ভ্রূণের বৃদ্ধি সম্ভবপর হত।
ডিমের খোসাতেও ছিল বিশেষ বৈশিষ্ট্য। সেখানে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ছিদ্র ছিল, যার মাধ্যমে গ্যাসের আদানপ্রদান সম্ভব হত। গবেষকদের ধারণা, ডিম মাটি, বালি ও গাছপালার নীচে থাকার ফলে শুকিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনাও কম থাকতো এবং প্রয়োজনীয় আর্দ্রতা বজায় থাকত। দক্ষিণ মেরুবৃত্তের এত কাছে ডাইনোসরের ডিমের জীবাশ্মের সন্ধান এই প্রথম। ফলে ডাইনোসর কতটা কঠিন ও দুঃসহ পরিবেশের সঙ্গে নিজেদের মানিয়ে নিতে সক্ষম হত, সে বিষয়ে নতুন তথ্য পাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। শুধু উষ্ণ দেশের প্রাণী নয়, প্রয়োজন হলে পৃথিবীর ঠান্ডা প্রান্তেও বংশবিস্তার করার ক্ষমতা ছিল তাদের, এই আবিষ্কার সেই ছবিটাই আরও একবার স্পষ্ট করেছে।