Calcutta Television Network

আদিম নেশা বৃত্তান্ত

আদিম নেশা বৃত্তান্ত
14 September 2026 05:21:01 pm

নেশার সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক আদিম। তবে সেই ইতিহাস ঠিক কতটা প্রাচীন, তা নিয়ে বহু সময়ে নানা প্রশ্ন ছিল বিজ্ঞানীদের মনে। মদ্যপানের প্রাচীনতম প্রমাণের বয়স কয়েক হাজার বছর। তবে মানুষের মাদক ব্যবহারের ইতিহাস যে তারও বহু পূর্বে শুরু হয়েছিল, সম্প্রতি ইঙ্গিত মিলেছে তারই। গবেষকরা দাবি করেছেন, প্রায় ২৫ হাজার বছর আগে সুপারি চুষে নেশা করত ইন্দোনেশিয়ার সুলাওয়েশি অঞ্চলের মানুষ। প্রত্নতাত্ত্বিকদের মধ্যে প্রচলিত ধারণা ছিল, কৃষির সূচনার পরেই মাদক ব্যবহারের চল ব্যাপকভাবে শুরু হয়। বর্তমান ইজরায়েলে প্রায় ১৩ হাজার বছর আগের গাঁজানো পানীয়ের সন্ধান মিলেছে। এটিকে বিশ্বের প্রাচীনতম অ্যালকোহলজাত পানীয়গুলির একটি বলে মনে করা হয়। বার্লি থেকে তৈরি ওই পানীয় সম্ভবত ব্যবহৃত হত নেশার জন্যও। কিন্তু তারও হাজার হাজার বছর আগে মানুষ কোনও উদ্ভিদজাত উপাদান ব্যবহার করে নেশা করত কি না, তার সুস্পষ্ট প্রমাণ এত দিন কোথাও ছিল না।

সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই গবেষণায় নামে অস্ট্রেলিয়ার গ্রিফিথ বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল গবেষক। ‘অস্ট্রেলিয়ান রিসার্চ সেন্টার ফর হিউম্যান এভলিউশন’-এর গবেষক কার্নি ম্যাথেসন এবং মিশেল ল্যাংলির নেতৃত্বে তাঁরা পরীক্ষা চালান। ইন্দোনেশিয়ার সুলাওয়েশি থেকে পাওয়া দু’টি প্রাচীন কঙ্কালের দাঁত পরীক্ষা করা হয়। গবেষণার ফল প্রকাশিত হয়েছে ‘সায়েন্স অ্যাডভান্সেস’ পত্রিকায়। দু’টি কঙ্কালই এমন সময়ের, যখন ওই অঞ্চলের মানুষ মূলত শিকার করেই জীবন কাটাত। অর্থাৎ তখনও কৃষিকাজ সেভাবে শুরু হয়নি। পরীক্ষায় একটি কঙ্কালের বয়স আনুমানিক ২৫ হাজার থেকে ১৬ হাজার বছর এবং অন্যটির বয়স প্রায় ৭৬০০ থেকে ৬৩০০ বছর বলে জানা গেছে। সবচেয়ে বেশি নজর কেড়েছে তাঁদের উভয়ের দাঁতের গঠন। দু’জনের দাঁতেই দেখা গিয়েছে গভীর ও প্রায় গোলাকার ধরনের ক্ষত বা দাগ। গবেষকদের ধারণা, শুধুমাত্র সাধারণ খাবার খাওয়ার ফলে এই ধরনের ক্ষয় হওয়ার সম্ভাবনা একেবারেই কম। দীর্ঘ সময় মুখের মধ্যে শক্ত কোনও বস্তু রেখে চোষার ফলেই এমন চিহ্ন তৈরি হতে পারে। সেখান থেকেই সামনে আসে সুপারির নেশা করার সম্ভাবনা। দীর্ঘক্ষণ আস্ত সুপারি মুখে রেখে চুষলে তা থেকে দাঁতের ক্ষয় হয় ও গাল এবং দাঁতের উপর বিশেষ ধরনের একটি চাপ তৈরি হয়। তার ফলে এমন গোলাকার গর্ত বা খাঁজ দেখা দিতে পারে।

আধুনিক যুগে পান-সুপারির সঙ্গে আমরা পরিচিত হলেও, হাজার হাজার বছর আগে মানুষ কী ভাবে সুপারি ব্যবহার করত, তার কোনও সুস্পষ্ট প্রমাণ ছিল না। বিষয়টি নিশ্চিত করতে গবেষকেরা পরীক্ষাগারে আস্ত সুপারি কৃত্রিম লালার মধ্যে রেখে পরীক্ষা করান। দেখা যায়, মুখের লালার সংস্পর্শে সুপারি থেকে আরেকলিন নামে এক ধরনের রাসায়নিক উপাদান বেরিয়ে আসে। এই উপাদান স্নায়ুতন্ত্রের উপর দীর্ঘ প্রভাব ফেলতে পারে। এরফলে শরীরে উত্তেজনা বা নেশার মতো অনুভূতি তৈরি হয়। শুধু পরীক্ষাগারের ফল নয়, প্রাচীন দাঁতের টিস্যুতেও আরেকলিনের চিহ্ন খুঁজে পেয়েছেন বিজ্ঞানীমহল। ফলে ওই মানুষদের জীবনে সুপারির ব্যবহার ছিল, এমন সম্ভাবনা আরও জোরালো হয়েছে। তাঁদের ধারণা, কৃষিকাজ শুরু হওয়ার বহু আগেই সুলাওয়েশি ও আশপাশের অঞ্চলের শিকারি জনগোষ্ঠীর মধ্যে সুপারি চোষার দীর্ঘ অভ্যাস গড়ে উঠেছিল। তবে সুপারি ব্যবহার সবসময় নেশার উদ্দেশ্যেই হত, এমনটাও কিন্তু নিশ্চিত করে বলা যায় না। গবেষকদের একাংশ মনে করছেন, দাঁতের ব্যথা বা অন্য কোনও শারীরিক সমস্যার সাময়িক আরাম লাঘব করতেও সুপারি ব্যবহার করা হয়ে থাকতে পারে। কিন্তু নিয়মিত এই অভ্যাসের ফল যে ভাল ছিল না, তার প্রমাণও মিলেছে প্রতিটি কঙ্কালে। সুপারি দীর্ঘদিন ব্যবহার করলে দাঁতের ক্ষতি হতে পারে। প্রাচীন ওই দুই মানুষের দাঁতেও গুরুতর ক্ষয়ের চিহ্ন রয়েছে। দাঁতের সমস্যা এতটাই বেড়ে যেতে পারে যে খাবার চিবিয়ে খাওয়াও বহুক্ষেত্রে কঠিন হয়ে ওঠে। অর্থাৎ, নেশার ইতিহাস শুধু সুরাপান বা আধুনিক মাদকের ইতিহাস নয়। মানুষের প্রাচীন জীবনযাত্রার মধ্যেই বিভিন্ন উদ্ভিদ ও রাসায়নিক উপাদান ব্যবহার করে শরীর ও মনের উপর তীব্র প্রভাব ফেলার চেষ্টা ছিল। সুলাওয়েশির প্রাচীন দাঁত সেই ইতিহাসেরই এক চমকপ্রদ সাক্ষ্য মাত্র।

×
  • CTVN