Calcutta Television Network

ব্রুনিকেল গুহার রহস্যময় পাথর

ব্রুনিকেল গুহার রহস্যময় পাথর
21 September 2026 12:35:48 pm

প্রায় ১ লক্ষ ৭৬ হাজার বছর পূর্বের ফ্রান্সের কোনো এক গুহা। অন্দরে তৈরী হয়েছে অদ্ভুত কিছু পাথরের কাঠামো। গোল করে সাজানো সেই নুড়িপাথরখন্ডগুলির সঙ্গে মিলেছে পোড়া হাড়ের চিহ্নও। গবেষকদের অনুমান, আধুনিক মানুষ নয়, নিয়ানডারথালরাই নামক প্রাণী এই কাজ করেছিল। তবে কেন তারা এত গভীরে গিয়ে পাথরগুলি সাজিয়েছিল, তার ব্যাখ্যা এখনও মেলেনি। দক্ষিণ-পশ্চিম ফ্রান্সের টার্ন-এ-গারোন অঞ্চলের অ্যাভিয়েরন গিরিখাত। তারই ভিতরে রয়েছে ব্রুনিকেল গুহা। বহু বছর লোকচক্ষুর অন্তরালে থাকার পর ১৯৯০ সালে একদল অভিযাত্রী প্রথমবার গুহাটির সন্ধান পান। বহু পাথরের স্তর সরিয়ে গুহার প্রবেশপথ খুঁজে পাওয়া যায়। সেখান থেকে প্রায় ৩৩৬ মিটার অন্দরে যাওয়ার পর রহস্যময় পাথরের কাঠামোগুলি নজরে আসে।

গুহার যে অংশে এগুলি পাওয়া গিয়েছে, সেখানে দিনের আলো পরিষ্কার পৌঁছয় না। মাটির উপর স্ট্যালাগমাইটের ভগ্নপ্রায় অংশ দিয়ে তৈরি হয়েছিল মোট ছ’টি কাঠামো। তার মধ্যে দু’টি সম্পূর্ণ গোলাকার। একটি তুলনায় বড়, অন্যটি ক্ষুদ্র। বাকি চারটির মধ্যে দু’টি বড় বৃত্তের ভিতরে এবং দু’টি বাইরে ছিল। ফ্রান্সের জাতীয় গবেষণা সংস্থা সিএনআরএস-এর তথ্য বলছে, গুহার প্রায় ১১২ মিটার এলাকা জুড়ে ছড়িয়ে ছিল প্রায় ৪০০টি পাথরের খন্ড। সব মিলিয়ে সেগুলির ওজন প্রায় ২.২ টন। পাথরগুলি যে স্বাভাবিক ভাবে সেখানে জমেনি, তার বেশকিছু প্রমাণও মিলেছে। বড় পাথরের ফাঁকে ছোট টুকরো ঢুকিয়ে কাঠামোগুলিকে শক্ত করা হয়েছিল। কিছু পাথর আবার বাইরের দিকে খাড়া করে রাখা ছিল। যেন পুরো নির্মাণকে ধরে রাখার ব্যবস্থা করা হয়েছিল সেগুলির মাধ্যমে। ২০১৩ সালে বর্দো বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক জ্যাক জবারের নেতৃত্বে একটি দল পাথরগুলির বয়স নির্ধারণের কাজে হাত দেন। পরীক্ষানিরীক্ষার পরবর্তীতে জানা যায়, সেগুলির বয়স আনুমানিক ১ লক্ষ ৭৬ হাজার ৫০০ বছর। ২০১৬ সালে গবেষণাটি ‘নেচার’ পত্রিকায় প্রথম প্রকাশিত হয়। তৎকালীন ইউরোপে আধুনিক মানুষের উপস্থিতির কোনও প্রমাণ ছিল না। তাই গবেষকদের ধারণা, এই কাঠামো তৈরির পিছনে নিয়ানডারথালদেরই ভূমিকা ছিল, যারা মানুষেরই আদিম সংস্করণ। আরও একটি বিষয় গবেষকদের নজর কেড়েছে। কাঠামোগুলির মধ্যে পাওয়া গিয়েছে আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত পাথর এবং পোড়া হাড়ের টুকরো। কিছু স্ট্যালাগমাইটের অংশ কালচে বা লালচে হয়ে গিয়েছিল।

পরবর্তীতে পরীক্ষা করে দেখা যায়, এগুলি আগুনের সংস্পর্শে এসেছিল এবং হাড়গুলি নিয়ন্ত্রিত ভাবে ঝলসানো হয়েছিল। ফলে অনুমান করা হয়, গুহার অন্ধকার অংশে আলো ও তাপের জন্য আগুন ব্যবহার হতো আদিমকালে। তবে নিয়ানডারথালরা কী উদ্দেশ্যে সেখানে গিয়েছিল, তা এখনও অজানা। গুহার ভিতরে বসবাসের স্পষ্ট কোনও প্রমান মেলেনি। পাওয়া যায়নি কোনও পাথরের অস্ত্র বা দৈনন্দিন ব্যবহার্য সরঞ্জাম। এমনকি নিয়ানডারথাল বা অন্য কোনও মানবপ্রজাতির হাড়ও খুঁজে পাওয়া যায়নি। ফলে এটি বসবাসের জায়গা ছিল কি না, তা নিশ্চিত করে বলার কোনো উপায় নেই। গুহাটির প্রবেশপথ নিয়েও পরে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সামনে আসে। ১৯৯০ সালে অভিযাত্রীরা যে পথ দিয়ে প্রবেশ করেছিলেন, সেটি এতটাই সরু যে সেখানে পৌঁছতে দড়ি ছাড়াও অন্যান্য সরঞ্জামের প্রয়োজন হয়েছিল।

গবেষকদের মতে, প্রাচীন মানুষের পক্ষে ওই পথ ব্যবহার করা কার্যত কঠিন ছিল। প্রত্নতত্ত্ববিদ কিম জেনুইটের গবেষণায় জানা যায়, গুহার আসল প্রবেশপথটি এক সময়ে দুই মিটারেরও কম উঁচু ছিল। প্রায় ১ লক্ষ ৪২ হাজার ৯০০ বছর আগে ভূমিধসের ফলে সেই পথ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায় বলে অনুমান করা হচ্ছে। এই প্রাকৃতিক বিপর্যয়ই হয়তো গুহার ভিতরের কাঠামোগুলিকে দীর্ঘদিন অক্ষত রেখেছিল। কিন্তু পাথরের সেই গোলাকার বস্তুগুলি নির্মাণের উদ্দেশ্য এখনও আঁধারেই। কারও ধারণা, শীতের সময়ে নিয়ানডারথালরা সেখানে হয়ত সাময়িকভাবে আশ্রয় নিত। আবার কেউ মনে করেন, কোনও বিশেষ সামাজিক বা ধর্মীয় আচারের জন্য জায়গাটি ব্যবহার করা হয়ে থাকতে পারে। তবে এখনও পর্যন্ত কোনও তত্ত্বের পক্ষেই নিশ্চিত কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। ফলে ব্রুনিকেল গুহার পাথরের বৃত্ত আজও মানব ইতিহাসের অন্যতম রহস্যময় নিদর্শন হয়ে বিদ্যমান। এত প্রাচীন সময়ে অন্ধকার গুহার এত গভীরে গিয়ে পরিকল্পিত ভাবে এমন কাঠামো তৈরি করার প্রয়োজনই বা কেন হয়েছিল; সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই এখনও গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছেন বিজ্ঞানীরা।

×
  • CTVN