রাশিয়ার গবেষণাগার। একমনে গবেষণারত এক তরুণী। চলছে পরীক্ষা-নিরীক্ষা। হঠাৎই বিস্ফোরণ একটি টেস্টটিউবে। ভেঙে চুরমার। অ্যালার্ম বাজলো তৎক্ষণাৎ। কয়েক দিনের মধ্যে অসুস্থ হয়ে পড়েন ওই তরুণী। শারীরিক অবস্থার অবনতি হয় ও মারাও যান। দারিয়া শিপিলোভা নামে ওই তরুণী, প্লেগরোগের ওষুধ নিয়ে দীর্ঘ গবেষণারত ছিলেন। ওই টেস্টটিউব ভর্তি ছিল প্লেগরোগের জীবাণুতে। তারপর নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত ও ঢলে পড়া মৃত্যুর কোলে।
একসময় গোটা ইউরোপ তছনছ হয়ে গিয়েছিল এই মহামারীতে। ইতিহাস তাঁকে ব্ল্যাক ডেথ বলে মনে রেখেছে। গবেষণায় পরবর্তী সময়ে জানা যায় প্লেট প্রথম ইউরো পয়সার নব্য প্রস্তর যুগের শেষ ভাগ থেকে প্রারম্ভিক ব্রোঞ্জযুগ পর্যন্ত মানুষকে সংক্রমিত করেছে। ৩০০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দের প্রাচীন সুইডিশ সমাধিতে এর উল্লেখ পাওয়া যায়। ট্রাজানের রাজত্বের আগে রোমান সাম্রাজ্যে বুবোণিক প্লেগের আবির্ভাব ঘটেছিল। সাইবেরিয়ার একটি হ্রদের নিকটবর্তী চারটি কবরস্থানে ১৮ জন প্রাচীন শিকারির দেহ পরীক্ষা করা হয়। সেখানেও তাঁদের ডিএনএতে এই রোগের অস্তিত্বের প্রমাণ মিলেছে। তবে আধুনিক পৃথিবীতে এই রোগের সাম্প্রতিকতম উদাহরণ হল, ইউরোপ। যা প্রসিদ্ধ ব্ল্যাক ডেথ নামে। সাধারণত ইঁদুরের গায়ে উৎপন্ন মাছি থেকে এই রোগ সংক্রামিত হয়। যদিও এটি ছড়ায় বাতাসে আক্রান্তের ড্রপলেটের মধ্যে দিয়েও। মানব ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়ঙ্কর মহামারীগুলির একটি ছিল এই রোগ। ইউরোপীয় জনসংখ্যার ৩০-৬০% মানুষ এই রোগের কবলে পড়ে প্রাণ হারান। মধ্যপ্রাচ্যেও এই রোগ কড়াল গ্রাসে থাবা বাড়িয়েছিল। এর বিপুল প্রভাবে অর্থনীতির পাশাপাশি জনসংখ্যা ও সংস্কৃতিগত পার্থক্যও চোখে পড়েছিল। বিখ্যাত শিল্পীদের তুলিতেও সেইসময় প্লেগের ছবি ফুটে ওঠে।
বর্তমানে দারিয়া শিপিলোভা নামে ওই তরুণীর মৃত্যুর পর রাশিয়ার প্রশাসন স্বাভাবিকভাবেই আবার নড়েচড়ে বসেছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার রাশিয়ার কাছে রিপোর্ট তলব করে পাঠিয়েছে। তরুণীর সংস্পর্শে আসা ২০০ জনকে কোয়ারেন্টাইনে পাঠানো হয়েছে।
ভারতেও রয়েছে এই রোগের দীর্ঘ ইতিহাস। ১৮৯৬ সালে প্লেগ আঘাত এনেছিল ভারতে। পুনে, কলকাতাসহ অবিভক্ত ভারতের ও অধুনা পাকিস্তানের করাচির বুকেও এই রোগ ছড়িয়ে পড়ে। আক্রান্ত হওয়ার সাত দিনের মধ্যেই ভয়াবহ সংক্রমণ ছড়াতে পারে এই রোগ। ফুসফুসে গভীর প্রভাব বিস্তার করে এই রোগ। একসময় নিউমোনিক প্লেগের কোনও চিকিৎসা বিশ্বে ছিল না, এখন যদিও অ্যান্টিবায়োটিক পাওয়া যায়। তবে দ্রুত রোগ শনাক্ত হলে তবেই রোগীকে বাঁচানো সম্ভব। সারাবিশ্বের মানুষই তাই করোনার পর আবারও কোনো ভয়ঙ্কর মহামারীর আগমন ঘটবে কিনা, সে বিষয়ে চিন্তার প্রহর গুনছে।