ভাবুন তো প্রফেসর শঙ্কু যদি শ্যাঙ্কোপ্লেনে চাপার আগে সন্ধান পেত কোনো অলৌকিক শব্দের। কিংবা বঙ্কুবাবু ভিনগ্রহী দর্শন লাভ না করে শুধুই শুনতে পেত তার কথা। তাক লাগতো কিনা?! জ্যোতির্বিজ্ঞানীরাও তেমনই হাতে পেলেন মহাকাশের আরও একটি রহস্যের সন্ধান। আমাদের সৌরজগতের বাইরে থাকা একটি গ্রহ থেকে আসা রেডিয়ো তরঙ্গ প্রথম বার সরাসরি শনাক্ত করা গেছে। তবে এই সঙ্কেতের সঙ্গে ভিন্গ্রহের প্রাণের অস্তিত্বের কোনও সরাসরি সম্পর্ক আছে কিনা সে বিষয়ে একদমই নিশ্চিত নয় বিজ্ঞানীমহল। এই তরঙ্গ ওই গ্রহের অত্যন্ত শক্তিশালী চৌম্বক ক্ষেত্রের অস্তিত্বেরও সাক্ষ্যবহনকারী হতে পারে। গবেষকদের নজরে আসা গ্রহটির নামকরণ করা হয়েছে ‘বিটা পিক্টোরিস বি’। পৃথিবী থেকে প্রায় ৬৩ আলোকবর্ষ দূরে অবস্থান করছে এটি। একটি আলোকবর্ষ বলতে আলো এক বছরে যে দূরত্ব অতিক্রম করে, তা বোঝানো হয়। সংখ্যায় যা প্রায় ৯.৫ লক্ষ কোটি কিলোমিটারের কাছাকাছি। মহাজাগতিক হিসেব অনুযায়ী যদিও ৬৩ আলোকবর্ষ খুব বেশি দূরত্ব নয় বলেই মনে করেন বিজ্ঞানীরা। ‘বিটা পিক্টোরিস বি’ কোনও ক্ষুদ্র গ্রহ নয়। এটি একটি বিশাল গ্যাসীয় গ্রহ, যার আকার বৃহস্পতির প্রায় তিন গুণের সমান। ভরের দিক থেকেও বৃহস্পতির তুলনায় এটি প্রায় ১২ গুণ ভারী। গ্রহটি ‘বিটা পিক্টোরিস’ নামের একটি নক্ষত্রকে কেন্দ্র করে ক্রমাগত আবর্তিত হয়। সেই নক্ষত্রের ভর সূর্যের প্রায় ১.৭৫ গুণ। এই গ্রহ থেকে রেডিয়ো তরঙ্গ আসার বিষয়টি এর আগে জানা যায়নি। দক্ষিণ আফ্রিকায় থাকা ৬৪টি রেডিয়ো টেলিস্কোপের সাহায্যে গবেষকেরা এ বার সেই সঙ্কেত ধরতে সক্ষম হয়েছেন। হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এডো বার্জারের নেতৃত্বে গোটা গবেষণাটি সম্পূর্ণ হয়েছে।
বিজ্ঞানীদের ধারণা, গ্রহটির মেরু অঞ্চলে তৈরি হওয়া অরোরা বা মেরুজ্যোতি থেকেই এই রেডিয়ো তরঙ্গের উৎপত্তি। পৃথিবীর মেরু অঞ্চলেও অরোরা দেখা যায়। সূর্য থেকে ছুটে আসা বৈদ্যুতিক কণার সঙ্গে পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের বিভিন্ন গ্যাসের সংঘর্ষের ফলে আকাশে তৈরি হয় রঙিন আলোর সেই খেলা। ‘বিটা পিক্টোরিস বি’-তেও একই ধরনের ঘটনা ঘটতে পারে বলে মনে করছেন গবেষককুল। তবে সেখানে এই প্রক্রিয়ার জন্য প্রয়োজন অত্যন্ত শক্তিশালী চৌম্বক ক্ষেত্র। গবেষকদের মতে, গ্রহটির চৌম্বক ক্ষেত্র বৃহস্পতির তুলনায় অন্তত ২০০ গুণ অধিক শক্তিশালী হতে পারে। চৌম্বক ক্ষেত্র একটি গ্রহকে মহাকাশ থেকে আসা বিভিন্ন ক্ষতিকর কণার হাত থেকে বহুলাংশে রক্ষা করতে পারে। তাই নতুন এই পর্যবেক্ষণ শুধু একটি রেডিয়ো সঙ্কেতের সন্ধান নয়, বরং অন্য সৌরজগতের একটি বিশাল গ্রহের পরিবেশ ও গঠন সম্পর্কে জানারও নতুন দরজা উন্মোচন করে দিয়েছে। আরও একটি কারণে এই আবিষ্কার গুরুত্বপূর্ণ। ‘বিটা পিক্টোরিস’ নক্ষত্রমণ্ডলটি আমাদের সৌরজগতের তুলনায় অত্যন্ত তরুণ। পৃথিবীর সৌরজগতের বয়স প্রায় ৪৬০ কোটি বছর। সেখানে ‘বিটা পিক্টোরিস’ ব্যবস্থার বয়স আনুমানিক ২ কোটি ৩০ লক্ষ বছর। এখনও পর্যন্ত ওই নক্ষত্রকে ঘিরে তিনটি গ্রহের সন্ধান পাওয়া গিয়েছে। ২০০৮ সালে আবিষ্কার হয় ‘বিটা পিক্টোরিস বি’, ২০১৯ সালে পাওয়া যায় ‘বিটা পিক্টোরিস সি’। সম্প্রতি, চলতি বছরে আবিষ্কৃত হয়েছে তৃতীয় গ্রহ ‘বিটা পিক্টোরিস ডি’। নতুন এই পর্যবেক্ষণের ফলে দূরের গ্রহগুলির চৌম্বক ক্ষেত্র এবং সেখানকার পরিবেশ সম্পর্কে আরও বিস্তারিত তথ্য জানার সুযোগ তৈরি হল বলে মনে করছেন বিজ্ঞানীমহল। সবকিছু গবেষণার মাধ্যমে জানতে পারলে যে আমরা দিব্যি গোলাপি বাবুর পেগাসাসে চেপে ভিনগ্রহে পাড়ি দিতে পারবো না, তার কিন্তু কোনো গ্যারান্টি নেই!