সন্তান না হওয়ার সমস্যায় এখন বহু দম্পতির ভরসা আইভিএফ পদ্ধতি। চিকিৎসাবিজ্ঞানের এই পদ্ধতিতে শরীরের বাইরে ডিম্বাণু ও শুক্রাণুর মিলন ঘটিয়ে তৈরি ভ্রূণ পরে জরায়ুতে প্রতিস্থাপন করা হয়। আজ দেশের বহু জায়গায় এই চিকিৎসা পাওয়া গেলেও ভারতে আইভিএফের শুরুটা একদমই সহজ ছিল না। এই পথ তৈরির পিছনে ছিলেন এক বাঙালি চিকিৎসক সুভাষ মুখোপাধ্যায় এবং তাঁর সহকর্মীরা। কিন্তু জীবদ্দশায় নিজের কাজের যথাযথ স্বীকৃতিপ্রাপ্তি থেকে বঞ্চিতই থেকেছেন তিনি। ১৯৫৫ সালে ক্যালকাটা ন্যাশনাল মেডিকেল কলেজ থেকে চিকিৎসাবিজ্ঞানে পড়াশোনা শেষ করেন সুভাষ মুখোপাধ্যায়। পরে কলকাতার নীলরতন সরকার মেডিকেল কলেজে কর্মরত অবস্থায় বন্ধ্যাত্ব নিয়ে শুরু করেন গবেষণা। বড় কোনও আর্থিক সাহায্য বা উন্নত পরিকাঠামো না থাকলেও নিজের উদ্যোগে একটি ছোটখাটো সাইজের গবেষণাগার তৈরি করেছিলেন তিনি। সেখানে তাঁর সঙ্গে কাজ করেন স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞ সুমিত মুখোপাধ্যায় এবং সরোজকান্তি ভট্টাচার্য। ষাটের দশকের শেষ দিকে ভারতে সন্তানহীনতার চিকিৎসা নিয়ে তেমন কোনও কার্যকরী সুব্যবস্থা ছিল না। এই পরিস্থিতিতে শরীরের বাইরে ভ্রূণ তৈরির সম্ভাবনা নিয়ে কাজ এগিয়ে নিয়ে যান তাঁরা। একই সময়ে ব্রিটেনেও রবার্ট এডওয়ার্ডস ও প্যাট্রিক স্টেপ্টোর নেতৃত্বে আইভিএফ নিয়ে গবেষণা অনেকটা এগিয়েছিল। দুই দেশের গবেষণার পথ আলাদা হলেও লক্ষ্য ছিল একই, জরায়ুর বাইরে নিষেক ঘটিয়ে পরে সেই ভ্রূণকে নারী শরীরে প্রতিস্থাপন করা। সীমিত সুযোগের মধ্যেও সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের দল একের পর এক পরীক্ষায় অগ্রসর হতে থাকেন। ডিম্বাশয় থেকে একাধিক ডিম্বাণু সংগ্রহের জন্য হরমোন ব্যবহারের পদ্ধতি, শরীরের বাইরে নিষেক এবং পরে ভ্রূণকে জরায়ুতে ফিরিয়ে দেওয়ার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে তাঁরা কর্মরত ছিলেন। ভ্রূণ সংরক্ষণের পদ্ধতি নিয়েও গবেষণা হয়। তরল নাইট্রোজেন ব্যবহার করে ভ্রূণ জমিয়ে রাখার প্রযুক্তি নিয়েও তাঁদের কাজ ছিল মনে রাখার মত। ১৯৬৭ থেকে প্রায় এক দশক ধরে এই গবেষণা এগিয়ে নিয়ে যান সুভাষবাবু। কিন্তু ১৯৭৬ সালে তাঁকে কলকাতা থেকে বাঁকুড়ায় বদলি করা হয়। গবেষণা থামাতে চাননি তিনি। তাই সপ্তাহের কাজ শেষে কলকাতায় ফিরে নিজের গবেষণার কাজ চালিয়ে যেতেন। এর মধ্যেই আসে সেই ঐতিহাসিক মুহূর্ত। ১৯৭৮ সালের ২৫ জুলাই ব্রিটেনে জন্ম নেয় বিশ্বের প্রথম আইভিএফের মাধ্যমে জন্ম নেওয়া শিশু লুইসি ব্রাউন। তার মাত্র ৬৭ দিন পর, ৩ অক্টোবর কলকাতায় জন্ম হয় ভারতের প্রথম টেস্টটিউব সন্তানের। চিকিৎসক সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের গবেষণার ফলেই জন্ম নেওয়া সেই শিশুর নাম ছিল কানুপ্রিয়া আগরওয়াল। ছোটবেলায় তাঁকে ‘দুর্গা’ নামে ডাকা হত।
ভারতে এই সাফল্য এলেও সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের জন্য পরিস্থিতি কখনোই সহজ হয়নি। তাঁর গবেষণাকে ঘিরে বিতর্ক তৈরি হয়। সহকর্মীদের বিরোধিতা এবং প্রশাসনিক অসহযোগিতার অভিযোগও উঠেছিল তৎকালীন সময়ে। গবেষণার সুযোগ সীমিত হয়ে পড়ে। দীর্ঘদিনের কাজের স্বীকৃতি না পাওয়ায় তিনি গভীর ভাবে ভেঙে পড়েন। পরবর্তীতে, ১৯৮১ সালে আত্মহত্যা করেন এই চিকিৎসক। তবে তাঁর কাজ সেখানেই থেমে যায়নি। তাঁর গবেষণা দলের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন ক্রায়োবায়োলজিস্ট সুনীত মুখোপাধ্যায়। ভ্রূণ সংরক্ষণের প্রযুক্তিগত দিক সামলানোর পাশাপাশি তিনি গবেষণার নথিও সংরক্ষণ করেছিলেন। পরে সেই নথি চিকিৎসক টিসি আনন্দ কুমারের কাছে পৌঁছয়। সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের গবেষণার ঐতিহাসিক গুরুত্ব সামনে আনার ক্ষেত্রে সেই নথি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। সুভাষবাবুর দলের আর এক গুরুত্বপূর্ণ সদস্য ছিলেন সরোজকান্তি ভট্টাচার্য। ডিম্বাণু সংগ্রহ, পরীক্ষাগারে নিষেক এবং পরে ভ্রূণ জরায়ুতে স্থাপনের প্রক্রিয়ায় তাঁর ভূমিকা ছিল মনে রাখার মত। পরবর্তী সময়ে ভারতে সহায়ক প্রজনন চিকিৎসার অগ্রগতিতেও এই চিকিৎসকদের কাজের প্রভাব পড়ে। ১৯৮৬ সালে টিসি আনন্দ কুমারের উদ্যোগে ভারতে আর একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক স্থাপিত হয়। পরে ২০০৩ সালে সরকারি ভাবে সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের গবেষণার স্বীকৃতি প্রতিষ্ঠিত হয়। আজ বন্ধ্যাত্বের চিকিৎসায় আইভিএফ বহুল ব্যবহৃত একটি পদ্ধতি। বয়স বাড়ার সঙ্গে বিয়ে ও সন্তান নেওয়ার সময় পিছিয়ে যাওয়া, কর্মসূত্রে দম্পতির আলাদা জায়গায় থাকা এবং বিভিন্ন শারীরিক সমস্যার কারণে অনেকেই এই চিকিৎসা ব্যবস্থার সাহায্য নেন। মহিলাদের ফাইব্রয়েড, এন্ডোমেট্রিয়োসিস বা পিসিওএস এবং পুরুষদের শুক্রাণু সংক্রান্ত সমস্যাও গর্ভধারণে বাধা প্রদান করতে পারে। তবে চিকিৎসকেরা মনে করিয়ে দেন, আইভিএফ কোনও নিশ্চিত সাফল্যের পদ্ধতি নয়। চিকিৎসা শুরু করার আগে সমস্যার কারণ সর্বাগ্রে খুঁজে দেখা জরুরি। অনেক ক্ষেত্রে প্রথমে আইইউআইয়ের মতো অপেক্ষাকৃত সহজ পদ্ধতি ব্যবহার করে চেষ্টা করা হয়। প্রয়োজন হলে পরে আইভিএফের কথা ভাবা হয়। এই চিকিৎসা যেমন সময়সাপেক্ষ, তেমনই খরচও কম নয়। এক বারেই সাফল্য আসবে, এমন নিশ্চয়তাও নেই। বার বার চেষ্টা করতে হলে আর্থিক চাপের পাশাপাশি ওষুধ ও হরমোনের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার বিষয়টিও চিকিৎসকদের মাথায় রাখতে হয়। একাধিক ভ্রূণ জরায়ুতে স্থাপন করলে একসঙ্গে একাধিক সন্তানের সম্ভাবনা বাড়তে পারে। তাই বর্তমানে অনেক ক্ষেত্রেই উপযুক্ত একটি ভ্রূণ বেছে নিয়ে প্রতিস্থাপনের দিকে গুরুত্ব দেওয়া হয়। ভারতে আইভিএফ আজ যতটা পরিচিত, তার পিছনে রয়েছে এক বঙ্গসন্তানের বহু দশকের গবেষণা। সেই ইতিহাসে সুভাষ মুখোপাধ্যায় এবং তাঁর সহযোগীদের অবদান চিরস্মরণীয়। জীবদ্দশায় স্বীকৃতি না পেলেও তাঁদের গবেষণাই পরবর্তী সময়ে ভারতে সহায়ক প্রজনন চিকিৎসার বিকাশের অন্যতম ভিত্তি হয়ে উঠেছে।