প্রায় ৭৪ হাজার বছর আগে পৃথিবীর ইতিহাসে ঘটে গিয়েছিল এক ভয়াবহ প্রাকৃতিক বিপর্যয়-ইন্দোনেশিয়ার মাউন্ট টোবা (Mount Toba) আগ্নেয়গিরির মহা অগ্নুৎপাত। গবেষকদের মতে এটি পৃথিবীর অন্যতম বৃহৎ আগ্নেয়গিরির অগ্নুৎপাত, যার প্রভাব শুধু স্থানীয় অঞ্চলে নয়, গোটা পৃথিবীর জলবায়ুতেও পড়েছিল। অনেক বিজ্ঞানী মনে করেন, এই অগ্নুৎপাত মানবসভ্যতাকে প্রায় বিলুপ্তির মুখে ঠেলে দিয়েছিল।
তবে সাম্প্রতিক গবেষণা বলছে, মানুষ শুধু টিকে থাকেনি-বরং পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিজেদের জীবনযাত্রা বদলে ফেলেছিল। বিশেষ করে বদলে গিয়েছিল তাদের খাদ্যাভ্যাস ও শিকারের ধরন।
অগ্নুৎপাতের পরে আগ্নেয়গিরির ছাই এশিয়া ও আফ্রিকার বিস্তীর্ণ অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে। এর ফলে পৃথিবীর তাপমাত্রা হঠাৎ কমে গিয়ে তৈরি হয় তথাকথিত 'ভলকানিক উইন্টার'-অর্থাৎ অগ্নুৎপাতজনিত দীর্ঘ শীতল আবহাওয়া। এতে বনজ প্রাণীর সংখ্যা কমে যায় এবং শিকার পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।
এই পরিস্থিতিতে মানুষ নতুন খাদ্যের সন্ধান করতে শুরু করে। গবেষণায় দেখা গেছে, আফ্রিকার ইথিয়োপিয়ার Shinfa‑Metema অঞ্চলে বসবাসকারী আদিম মানুষদের খাদ্য তালিকায় তখন উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আসে। আগে যেখানে মাছ খাওয়ার হার ছিল প্রায় ১৪ শতাংশ, অগ্নুৎপাতের পরে তা বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ৫২ শতাংশ। অর্থাৎ মানুষ ক্রমশ নদী ও জলাশয় নির্ভর খাদ্যের দিকে ঝুঁকে পড়ে।
গবেষকরা বিভিন্ন পোড়া হাড়, মাছের জীবাশ্ম ও প্রাচীন সরঞ্জাম বিশ্লেষণ করে এই তথ্য পেয়েছেন। এমনকি ত্রিভুজাকৃতির পাথরের ফলাও পাওয়া গেছে, যা সম্ভবত তিরের মতো অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হত-দূর থেকে শিকার ধরার জন্য।
অগ্নুৎপাতের পরে অনেক নদী শুকিয়ে ছোট ছোট জলাশয়ে পরিণত হয়েছিল। সেই জলাশয়ের কাছে প্রাণীরা জল খেতে আসত, ফলে সেখানে শিকার করা সহজ হত। আবার জল কমে যাওয়ায় মাছ ধরাও সহজ হয়ে উঠেছিল। খাবার ফুরিয়ে গেলে মানুষ সেই জলাশয় ছেড়ে নতুন জায়গায় চলে যেত।
গবেষকদের মতে, এই ঘটনাই প্রমাণ করে-প্রতিকূল পরিস্থিতিতে মানুষ ভেঙে পড়েনি। বরং পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাইয়ে খাদ্যাভ্যাস, শিকার পদ্ধতি এবং বসবাসের ধরন বদলে তারা টিকে থাকার পথ খুঁজে নিয়েছিল।