মঙ্গল গ্রহ-লালচে আলোয় মোড়া এই গ্রহকে ঘিরে মানুষের কৌতূহল আজও অশেষ। আকাশের দূর প্রান্ত থেকে লাল বিন্দুর মতো যে গ্রহটিকে দেখা যায়, তার বুকের ভেতরে কী রহস্য লুকিয়ে রয়েছে, তা জানতে পৃথিবীজুড়ে চলছে নিরন্তর গবেষণা। আর এবার সেই রহস্যের মেঘ কাটাতে সাহায্য করেছে নাসার মহাকাশযান ‘ইনসাইট’ ল্যান্ডার।
২০১৮ সালের নভেম্বরে মঙ্গলের মাটিতে পা রাখে ইনসাইট। এর প্রধান কাজ ছিল মঙ্গলের ভূমিকম্প (Marsquakes) রেকর্ড করা এবং ভেতরের গঠন সম্পর্কে তথ্য জোগাড় করা। প্রায় চার বছর ধরে, ২০২২ সাল পর্যন্ত এটি মঙ্গলে ১৩১৯টি ভূমিকম্প চিহ্নিত করেছে। সেই কম্পনের তরঙ্গ বিশ্লেষণ করেই উঠে এসেছে অভাবনীয় তথ্য।
মঙ্গলেরও যেমন বায়ুমণ্ডল রয়েছে, তেমনই তার গঠনও পৃথিবীর মতো তিন ভাগে বিভক্ত- কোর (কেন্দ্রভাগ), ম্যান্টল (আবরণী), ক্রাস্ট বা পৃষ্ঠদেশ।
কিন্তু পার্থক্যও কম নয়। মঙ্গলের বায়ুমণ্ডলে কার্বন ডাই অক্সাইডের আধিক্য পৃথিবীর মতো প্রাণের সম্ভাবনাকে কঠিন করে তোলে। আর এখন জানা গেল, এর ম্যান্টল-এ লুকিয়ে আছে কোটি কোটি বছরের পুরনো মহাজাগতিক ধাক্কার ইতিহাস।
প্রায় ৪.৫ বিলিয়ন বছর আগে, সৌরমণ্ডল গঠনের শুরুর সময়েই এক প্রকাণ্ড মহাজাগতিক বস্তু মঙ্গলের সঙ্গে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়েছিল। বিজ্ঞানীদের ধারণা, বস্তুটি ছিল এক বিশাল উল্কাপিণ্ড বা গ্রহাণু। সেই আঘাতের টুকরো আজও মঙ্গলের ম্যান্টল-এ রয়ে গেছে। প্রায় ৪ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে ছড়িয়ে আছে সেই প্রাচীন মহাজাগতিক টুকরো।
ব্রিটিশ বিজ্ঞানী কনস্টান্টিনোস চার্লামবুস এবং তাঁর দল মঙ্গলের আটটি বড় ভূমিকম্পের তরঙ্গ বিশ্লেষণ করে এই রহস্য উদঘাটন করেছেন। তাঁদের মতে- পৃথিবীর তুলনায় মঙ্গল অনেক ধীরে বিকশিত হয়েছে। সেই কারণেই ম্যান্টলে এখনও প্রাচীন মহাজাগতিক বস্তুর টুকরো সংরক্ষিত রয়েছে।
পৃথিবীর ক্ষেত্রে এত পুরনো সংঘর্ষের প্রমাণ আর মেলে না, কারণ আমাদের গ্রহ দ্রুত বিকশিত হয়ে পুরনো সব চিহ্ন মুছে দিয়েছে।
চার্লামবুসের কথায়, 'এর আগে কোনও গ্রহের অভ্যন্তর এত সূক্ষ্মভাবে দেখা যায়নি। আমরা যেন সময়ের গর্ভে জমে থাকা ইতিহাসের টুকরো হাতে পাচ্ছি।'
এই আবিষ্কার শুধু মঙ্গলের গঠন নিয়েই নয়, পুরো সৌরমণ্ডলের সৃষ্টি ইতিহাস বোঝার ক্ষেত্রেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এবার এটা দেখার বিষয় কীভাবে গ্রহগুলো একে অপরের সঙ্গে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়েছিল। পৃথিবীতে প্রাণের উপযোগী পরিবেশ কেন তৈরি হল, অথচ মঙ্গল আজও নিষ্প্রাণ-এই গবেষণা সকল প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে সাহায্য করবে।
লাল গ্রহের বুকের ভেতরে লুকিয়ে থাকা ৪৫০ কোটি বছরের পুরনো রহস্য এবার সামনে আসছে। কে জানে, আগামী গবেষণা হয়তো জানিয়ে দেবে-মঙ্গলের বুকে প্রাণের সম্ভাবনা আদৌ ছিল কি না!