Calcutta Television Network

খ্যাপাটে বিজ্ঞানী ওপেনহাইমারের জীবনের অজানা দিক...

খ্যাপাটে বিজ্ঞানী ওপেনহাইমারের জীবনের অজানা দিক...
7 October 2025 02:14:22 pm

১৯৪৫ সালের ১৬ জুলাই, নিউ মেক্সিকোর ইয়োর্নাদা দেল মুয়ের্তো মরুভূমি। সেখানে একটি বাংকারের ভিতরে বসে ছিলেন একজন বিজ্ঞানী, যার কাজ মানব ইতিহাসের এক অদ্ভুত অধ্যায়ের সূচনা করতে যাচ্ছিল। বাংকার থেকে মাত্র ১০ কিলোমিটার দূরে বিশ্বের প্রথম পারমাণবিক বোমার পরীক্ষা হবে বলে ঠিক হয়, যার সাংকেতিক নাম ‘ট্রিনিটি’। কাউন্টডাউন যেন অসীমকাল ধরে চলছিল। প্রতিটি সেকেন্ড যেন দীর্ঘায়িত হয়ে অনন্তকাল মনে হচ্ছিল। ভেতরে ভেতরে চাপা উত্তেজনা অনুভব করছিলেন জুলিয়াস রবার্ট ওপেনহাইমার।


ওপেনহাইমার ছিলেন উচ্চতা ৫ ফুট ১০ ইঞ্চি, দেখতে পাতলা ও হালকা। কিন্তু ম্যানহাটন প্রকল্পে তিন বছরের কাজ শেষে তাঁর ওজন কমে দাঁড়ায় মাত্র ৫২ কেজিতে। লম্বা মানুষের জন্য এটি অত্যন্ত কম। ট্রিনিটি টেস্টের আগের রাতে ওপেনহাইমার মাত্র চার ঘণ্টা ঘুমান। সারাক্ষণ মাথায় কাজ করছিল দুশ্চিন্তা, পাশাপাশি ধূমপানের অভ্যাসও তাঁর ঘুমকে ব্যাহত করেছিল।

২০০৫ সালে ইতিহাসবিদ কা বার্ড এবং মার্টিন জে শেরউইন ওপেনহাইমারের জীবন নিয়ে লিখেছিলেন ‘আমেরিকান প্রমিথিউস’ শীর্ষক জীবনীগ্রন্থ। এই বইয়ের ওপর ভিত্তি করে ২০২৩ সালের ২১ জুলাই মুক্তি পায় ক্রিস্টোফার নোলানের পরিচালিত ‘ওপেনহাইমার’ সিনেমা।

টেস্টের সময় ওপেনহাইমারের পাশে উপস্থিত ছিলেন একজন সামরিক কর্মকর্তা। ইতিহাসবিদদের বক্তব্য অনুযায়ী, ওই সময় ওপেনহাইমারের উত্তেজনা চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছিল। তারপর ঘটে সেই বিস্ফোরণ। ২১ কিলোটন টিএনটি সমৃদ্ধ বোমাটি তখন পৃথিবীর ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বিস্ফোরণ। শকওয়েভ ১৬০ কিলোমিটার দূরেও টের পাওয়া যায়। মরুভূমি কেঁপে ওঠে, আকাশে মাশরুম আকৃতির ধোঁয়া-অবয়ব ছড়িয়ে পড়ে। ওপেনহাইমার অভিভূত হলেও এক ধরনের স্বস্তি অনুভব করেছিলেন।

এর কয়েক মিনিট পরে তাঁর বন্ধু ও সহকর্মী ইসিডোর রবি তাঁকে দূর থেকে দেখেছিলেন। তিনি বলেছেন, 'আমি কখনো তাঁর সেই হাঁটার দৃশ্য ভুলব না। তিনি যেন দৃপ্ত পায়ে হেঁটে আসছেন, বোঝা যায় নিজের কাজ ঠিকভাবে শেষ করেছেন।'

১৯৬০-এর দশকে এক সাক্ষাৎকারে ওপেনহাইমার জানিয়েছেন, বিস্ফোরণের কয়েক মিনিট পর তাঁর মনে পড়ে ভগবদ্‌গীতার শ্লোক! 

এরপর ধীরে ধীরে তিনি হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়েন। কারণ তিনি জানতেন, এরপর মানব ইতিহাসে যে পরিবর্তন আসছে, তা অবশ্যম্ভাবী। তবে কয়েক দিন পর তাঁর চিন্তা-চেতনা পাল্টে যায়। যুদ্ধের সময়ে বোমার ব্যবহার যেন সর্বোচ্চ প্রভাব ফেলে, সে দিকে মনোযোগ দেন।

ট্রিনিটি টেস্টের মাত্র এক মাসের কম সময়ের মধ্যে হিরোশিমায় সফলভাবে বোমা ফেলা হয়। ওপেনহাইমার তখন বিজয়ী যোদ্ধাদের মতো দুহাত তুলে জয়ের আনন্দ প্রকাশ করেন।


ওপেনহাইমার ছিলেন ম্যানহাটন প্রকল্পের প্রধান পরিচালক। তাঁর নেতৃত্ব ছাড়া অন্য কেউ পারমাণবিক বোমাকে বাস্তবে রূপ দিতে পারতেন না। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষে জেরেমি বার্নস্টাইন উল্লেখ করেছেন, 'ওপেনহাইমারের পরিবর্তে অন্য কেউ পরিচালক হলে, যুদ্ধ শেষ হতো, তবে বোমার ব্যবহার ছাড়াই।'


ওপেনহাইমারের চরিত্রে উচ্চাকাঙ্ক্ষা, মহানুভবতা এবং হতাশা সবই বিদ্যমান ছিল। তাকে ইতিহাসবিদরা ‘রহস্য’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। একজন তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানী হলেও তাঁর মধ্যে নেতার গুণাবলি ছিল। শৈশব থেকেই তিনি রহস্যময় এবং মেধাবী ছিলেন।

ওপেনহাইমার ১৯০৪ সালে নিউইয়র্কে জন্মগ্রহণ করেন। বাবা-মা জার্মান ইহুদি, ধনী ব্যবসায়ী। আপার ওয়েস্ট সাইডে বিলাসবহুল অ্যাপার্টমেন্টে বেড়ে ওঠেন। ছোটবেলায় লাজুক এবং দুর্বল ছিলেন। খেলাধুলার নেশা ছিল না; বরং খনিজ পদার্থ সংগ্রহে মগ্ন থাকতেন।

৯ বছর বয়সেই গ্রিক ও লাতিন ভাষায় দক্ষ হয়ে ওঠেন। একবার নিউইয়র্কের মিনারেলজিক্যাল ক্লাবে খনিজ পদার্থের ওপর লেখা চিঠি পাঠান। এত দক্ষতার কারণে ক্লাবটি তাঁকে প্রাপ্তবয়স্ক মনে করে আমন্ত্রণ জানায়।


শৈশব থেকে তিনি ছিলেন কৌতূহলী, মেধাবী এবং একাকী মননের মানুষ। খেলাধুলায় দুর্বল হলেও খনিজ পদার্থ, বিজ্ঞান ও ভাষার প্রতি গভীর আগ্রহ ছিল।

ওপেনহাইমার ছিলেন উচ্চাকাঙ্ক্ষী, কিন্তু মানবিক। তিনি জানতেন, তাঁর কাজ পৃথিবীর জন্য কতটা গুরুত্বপূর্ণ এবং বিপজ্জনক। পারমাণবিক বোমার আবিষ্কার শুধুমাত্র বিজ্ঞান নয়, তা ছিল নৈতিক দ্বন্দ্বেরও পরীক্ষা। তিনি কখনও কখনও হতাশাগ্রস্ত, কখনও গর্বিত; সবই মানবতার জন্যই। ম্যানহাটন প্রকল্পের সময় তাঁর সিদ্ধান্তগুলি যুদ্ধের সমাপ্তি এবং মানুষের ক্ষতির পরিমাণকে প্রভাবিত করেছিল। তিনি প্রতিনিয়ত চেষ্টা করেছিলেন যাতে সর্বাধিক ক্ষতি হয়, কিন্তু নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে।

×
  • CTVN