আজকের দিনে ইয়ারফোন আমাদের জীবনের অপরিহার্য অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনলাইন ক্লাস, ওয়ার্ক ফ্রম হোম, ফোনে কথা বলা, গান শোনা কিংবা ভিডিয়ো দেখা—সবক্ষেত্রেই ইয়ারফোনের ব্যবহার স্বাভাবিক বিষয়। ছোট থেকে বড়, প্রায় সবারই দৈনন্দিন জীবনে ইয়ারফোন ব্যবহার করার অভ্যাস রয়েছে। তবে এই ছোট ডিভাইসটি যে আমাদের কান এবং সার্বিক স্বাস্থ্যের জন্য হুমকি হয়ে উঠতে পারে, সে বিষয়ে অনেকেই সচেতন নন।
আমাদের অনেকেরই অভ্যাস রয়েছে উচ্চ ভলিউমে দীর্ঘ সময় গান শোনার। এই অভ্যাস কেবল কানের ক্ষতি নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদে নানা শারীরিক ও মানসিক সমস্যার কারণ হতে পারে। সাধারণত আমরা দুই ধরনের ইয়ারফোন ব্যবহার করি—ব্লুটুথ (তারছাড়া) এবং তারযুক্ত (wired)। অনেকের ধারণা ব্লুটুথ ইয়ারফোন রেডিয়েশন নির্গত করে, তাই তা বেশি ক্ষতিকর। ফলে তারা সুরক্ষার জন্য তারযুক্ত ইয়ারফোন বেছে নেন। কিন্তু সাম্প্রতিক গবেষণা দেখিয়েছে, বাস্তবতা উল্টো।
গবেষণার চাঞ্চল্যকর ফলাফল
‘ওতোরিওলারিঙ্গোলজি অ্যান্ড হেড-নেক মেডিসিন’ জার্নালে প্রকাশিত একটি গবেষণায় ১৮ থেকে ২৬ বছর বয়সী মেডিকেল ছাত্রছাত্রীদের উপর পরীক্ষা চালানো হয়। ফলাফলে দেখা যায়-অংশগ্রহণকারীদের ৮৯.৩% অন্তত একটি কানের সমস্যায় ভুগছেন। এই সমস্যাগুলোর মধ্যে ছিল- কানে ব্যথা, চুলকানি, অতিরিক্ত কানের ময়লা জমা, সংক্রমণ, শ্রবণশক্তি হ্রাস। গবেষকরা লক্ষ্য করেছেন, এই সমস্যাগুলো তারযুক্ত ইয়ারফোন ব্যবহারকারীদের মধ্যে বেশি দেখা গেছে।
তারযুক্ত ইয়ারফোন কেন বেশি ক্ষতিকর?
হাইজিন সমস্যা – অনেকেই নিজের ইয়ারফোন অন্যকে দেন বা অন্যেরটা ব্যবহার করেন, যা জীবাণু সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়ায়।
পরিষ্কার না করা – ইয়ারফোনের স্পিকার গ্রিল বা সিলিকন টিপে জমে থাকা ধুলো ও ব্যাকটেরিয়া সরাসরি কানে প্রবেশ করে।
কানের ভেতরে গভীর প্রবেশ – তারযুক্ত ইয়ারফোন সাধারণত কানের গভীরে বসানো হয়, যা সংক্রমণ এবং ক্ষতির সম্ভাবনা বাড়ায়।
এই গবেষণায় শুধু কানের সমস্যা নয়, বরং আরও কিছু উদ্বেগজনক স্বাস্থ্য সমস্যা উঠে এসেছে- ৬৮% ব্যবহারকারীর মধ্যে মাথাব্যথা, মনোযোগের ঘাটতি, ঘুমের সমস্যা, উচ্চ রক্তচাপ, দুর্বলতা ও ক্লান্তি। বিশেষ করে যারা উচ্চ ভলিউমে দীর্ঘ সময় গান শোনেন, তাদের ক্ষেত্রে শ্রবণশক্তির ক্ষতি দ্রুত হয়।
গান বা ভিডিয়ো শুনতে হলে সম্ভব হলে ইয়ারফোন ছাড়াই শুনুন। ইয়ারফোন ব্যবহার করলেও সময়সীমা ১-২ ঘণ্টার মধ্যে রাখুন। ভলিউম সর্বোচ্চ ৬০% এর মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখুন। অন্যের ইয়ারফোন ব্যবহার করবেন না। প্রতিবার ব্যবহারের পর ইয়ারফোন পরিষ্কার করুন।
ব্লুটুথ ইয়ারফোন ব্যবহার করলে সিলিকন টিপযুক্ত মডেল বেছে নিন, যা জীবাণু সংক্রমণ কিছুটা কমায়।
এই গবেষণা স্পষ্টভাবে প্রমাণ করছে, ইয়ারফোন ব্যবহারের ঝুঁকি কেবল ব্লুটুথে সীমাবদ্ধ নয়। বরং তারযুক্ত ইয়ারফোনও দীর্ঘমেয়াদে সমান বা বেশি ক্ষতি করতে পারে। তাই সঠিক ব্যবহার ও পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখাই কানের সুস্থতার মূল চাবিকাঠি।