অসীম সেনঃ ভগবান শিব অমরকণ্টকে বসে তপস্যা করছিলেন। দরদর করে ঘাম হচ্ছে। সেই ঘাম থেকে সৃষ্টি হল নর্মদা নদী। আর একটি বিশ্বাস রয়েছে মহাবিশ্বের স্রষ্টা ব্রহ্মার চোখ থেকে দুটি অশ্রুবিন্দু পড়েছিল, যা থেকে নর্মদা ও সোন নদীর জন্ম হয়েছিল। কড়াইশুটির কচুরি-আলুরদম সঙ্গে গুলাবজামুন। দীপু প্লেট হাতে বলে চলেছে। মুখে কচুরি নিয়ে পঞ্চানন্দ তালুকদারের অভিব্যক্তি, ভগবানদের ব্যাপার স্যাপারই আলাদা। জানুয়ারির শেষ দিকে নর্মদা জয়ন্তী। গোটা মধ্যপ্রদেশ গেরুয়াময় হয়ে উঠবে। অমরকন্টক হয়ে উঠবে নর্মদা নগরী। সেজে উঠবে নদীর দুই পাড়। নর্মদা আরতি, ভজন কীর্তন সে একটা বিশাল ব্যাপার। এই নর্মদা জয়ন্তী উপলক্ষেই অমরকন্টক যাবার প্ল্যান করছেন তালুকদার দম্পতি। কয়েকদিন আগেই জব্বলপুর ঘুরে এসেছেন মেয়ে জামাইকে নিয়ে। তখনই শুনেছিলেন নর্মদা জয়ন্তীর কথা। ব্যাস টুলটুল বৌদির আদুরে আবদার। বেচারা পঞ্চানন্দ তালুকদার কী করেন। ডেকে পাঠালেন দীপুকে। এ বিষয়ে ছোকরার অগাধ জ্ঞান।
নর্মদা জয়ন্তী মাঘ মাসের শুক্লপক্ষের সপ্তমী তিথিতে পালিত হয়। এ দিনটা দেবী নর্মদার জন্মদিন। মধ্যপ্রদেশ গুজরাট আর মহারাষ্ট্রে এই উৎসব বেশ সমারোহে পালিত হয়। এমনিতে অমরকণ্টককে প্রকৃতি ঢেলে সাজিয়েছে। নর্মদা এবং সোন নদীর উৎপত্তিস্থল এই অমরকন্টক তীর্থরাজ নামেও পরিচিত। সংস্কৃতি অমরকন্টক অর্থ চিরন্তন উৎস। আবার অনেকে অমরকণ্টক নামের ব্যাখ্যায় বলেন এ নাম দিয়েছেন কালিদাস স্বয়ং একটা সময় শহরে প্রচুর আম অথবা আমড়া গাছ ছিল তাই এই স্থানটি অমরকূট নামে পরিচিত হয়। পুরাণ, ইতিহাস নিয়ে শহরটির মাহাত্ম নেহাত কম নয়। স্থানটি পাণ্ডব থেকে বিদেশী শাসক মিলিয়ে বহু শাসক শাসন করেছিলেন। এখানকার মন্দির গুলি এক একজন শাসকের বর্ণনা দেয়। শিব যখন ত্রিপুরাকে ধ্বংস করেছিল তখন তার ভস্ম অমরকন্টকে পড়েছিল, যা হাজার হাজার শিবলিঙ্গে পরিণত হয়েছিল। এমনই এক শিবলিঙ্গ জ্বলেশ্বরে দেখা যায়। বিশ্বাস করা হয় এখানে কেউ মারা গেলে তাঁকে স্বর্গে স্থান দেওয়া হয়। অতিরিক্ত জ্ঞান হলে এই মুশকিল। আসল টপিক ভুলে যায়। দীপু অমরকণ্টকে যাওয়া থাকা ঘোরার বিষয়ে কিছু বলো। একটু যেন অস্থির পঞ্চানন্দ তালুকদার। শালিমার থেকে কয়েকটা ট্রেন সরাসরি পেন্দ্রা রোড যায়। সেখান থেকে ট্যাক্সি বা বাসে করে অমরকণ্টক মাত্র ১৭ কিলোমিটার। অমরকণ্টকে বেশ কিছু সরকারি বেসরকারি থাকার জায়গা রয়েছে। আগে থেকে অনলাইন বুকিং করে নিতে হবে। ভারি সুন্দর জায়গা এই অমরকন্টক। সবুজ পাহাড়, চোখ জুড়ানো জলপ্রপাত। সব মিলিয়ে শীতকালীন ভ্রমণের জন্য অ্যাপ্রোপিয়েট।
অমরকণ্টকে নর্মদা আর সোন নদীর উৎপত্তি। একদিকে বিন্ধ্য, মাইকাল ও সাতপুরা পর্বতের মিলনস্থল সামান্য দূরে অমরকণ্টক মালভূমিতে নর্মদা কুণ্ড। এখানেই গড়ে উঠেছে বিভিন্ন মন্দির। নবম শতাব্দীতে রেওয়ার মহারাজা তৈরি করেন নর্মদা মন্দির। মন্দির চত্বরে রয়েছে হাতির মূর্তি। নর্মদা কুণ্ড ঘিরে রয়েছে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ সেগুন গাছের বন। কাছেই জ্বলেশ্বরের মন্দির। ত্রিপুর দুর্গ নগরী ধ্বংস করার পর মহাদেব নর্মদা দেবীর কাছে তাঁর অস্ত্র সমর্পন করেছিলেন এই স্থানে একটি শিব লিঙ্গ প্রকাশ পায় যা পরম শক্তির প্রতীক। প্রাচীন এই মন্দির চত্ত্বর থেকে মহেশ্বর নদী এবং নর্মদা নদীর সঙ্গমও দেখা যায় ।
দেখে নেবেন কপিলধারা জলপ্রপাত। নর্মদা কুন্ড থেকে ছয় কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এই জলপ্রপাত। প্রায় ১০০ ফুট ওপর থেকে নর্মদা নদীর জল প্রবল বেগে নেমে এসেছে। কালচুরি কারিগরদের জটিল শিল্পকর্ম দেখে অবাক হয়ে যাবেন। ত্রিমুখী মন্দির তিন মুখো শিব মূর্তির জন্য বিখ্যাত। এটি কর্ন মন্দির নামেও পরিচিত। মন্দিরের স্থাপত্যে নাগরা দ্রাবিড় ও কলিঙ্গ শৈলীর মিশ্রন দেখা যায়।
নর্মদা জয়ন্তী উপলক্ষে যাচ্ছেন তো সকাল-সন্ধ্যা নর্মদা কুন্ডে আরতিতে যোগদিন। এখানেই রয়েছে কবীর চবুতরা। এখানে সন্ত কবীর বহু বছর ধ্যান করেছেন। আর একটা বিষয় আপনাকে জানিয়ে রাখি নর্মদা নদী কিন্তু গঙ্গা নদীর থেকেও অনেক পুরানো। সুতরাং অমরকণ্টক বেড়িয়ে এলে ডবল প্রফিট। ঘোরাও হল সঙ্গে পূণ্য ফ্রি। এতক্ষণে মন ভরেছে পঞ্চানন্দ তালুকদারের। নরম সুরে বললেন তা ভায়া এখন তো টিকিট পাওয়া মুশকিল। তা তোমার জামাইবাবুকে বলে দেখনা একবার যদি কিছু ব্যবস্থা করা যায়। শেষ গুলাবজামুনটা একেবারে মুখে পুড়ে দিল দীপ।