অসীম সেন: বালির সমুদ্র মাঝে মাঝে পাথের ঢিপি রিক্ত প্রকৃতির মধ্য দিয়ে বয়ে চলেছে হিঙ্গুল নদী। হিঙ্গুল অর্থ সিঁদুর। হিংলাজ মাতার সিঁদুর থেকেই হয়তো নদীর নাম। হিঙ্গুল নদী নাকি গঙ্গার মতই পবিত্র। সতীর মাথা পড়েছিল এখানে। জায়গাটি যেমন দুর্গম তেমনই পবিত্র। করাচি থেকে হিংলাজ মাতার মন্দির ২৫০ কিলোমিটার পথ। আগে মরুভূমি পার করে দেবী দর্শনে যেতে হত পায়ে হেঁটে। সময় লাগত বেশ কয়েক সপ্তাহ। এখন সময় বদলেছে। পিচ কালো রাস্তা দিয়ে এসইউভি ছোটে একশ কিলোমিটার প্রতি ঘণ্টায়। করাচির সীমা ছাড়াতেই জনমানুষ ধীরে ধীরে বিলীন হয়ে আসে। মরুভূমি অঞ্চল। মাঝে মধ্যে একটি দুটি মানুষ সঙ্গে উট। রাস্তায় পড়বে কতগুলি গ্রাম। গ্রাম বলতে ত্রিশ-পঞ্চাশ মানুষের বাস। যতদূর চোখ যায় জনশূণ্য প্রান্তর। রাস্তাতেই পড়বে পাক এয়ারফোর্সের ঘাঁটি। তবে ক্যামেরার লেন্স বন্ধ রাখাই ভালো। পথের মাঝে এক আধবার থামা যেতে পারে। গাছের ছায়ায় মিলবে কিছু গ্রাম্য দোকান। চায়ের ভাঁড়ে গলা ভিজিয়ে নিয়ে আবার যাত্রা। হিংলাজ মন্দিরের কাছে বাড়বে টিলার সংখ্যা। কোনও টি পাথরের কোনও টি আবার তৈরি বালি আর মাটি দিয়ে। জল-বাতাসের অত্যাচারে এই নরম পাহাড়গুলির গায়ে প্রকৃতির আলপনা।
বেলুচিস্তানের এই অঞ্চলটি ঘোষিত জাতীয় উদ্যান। ছয় হাজার বর্গ কিলোমিটার আয়তনের হিঙ্গুল ন্যাশনাল পার্ক। এমনিতে শান্ত নদী হিঙ্গুল। তবে বর্ষায় এর রূপ উগ্র। নদী পার হয়ে ডানদিকে হিংলাজ মাতার মন্দির। স্থানীয়রা ডাকে নানী মন্দির বলে। স্থানীয় মুসলিমদের কাচে হিংলাজ মাতা নানী বিবি। শেষ ১০ কিলোমিটার ধুলোময় পথ। এই এলাকাটি পরিচিত অঘোরী নামেও। সম্ভবত জায়গাটি কোনও কালে অঘোরী সম্প্রদায়ের সাধনক্ষেত্র ছিল। মন্দিরের পাশেই বালোচ উপজাতির বাস। হিংলাজ মায়ের মন্দির তারাই সারাবছর দেখাশোনা করেন। হিংলাজ মাতার মন্দিরের প্রবেশ পথে প্রথমেই পড়বে পাহাড়ের ওপর মেলদীমাতার মন্দির। তারপরেই হিংলাজ মাতার মন্দির। মন্দিরের সামনে ছোট একটা পুকুর। ছোট ছোট মাছ ঘুরে বেড়াচ্ছে। এখান থেকেই মূল মন্দিরের প্রবেশ পথ। মায়ের মন্দির পাহাড়ের গুহার ভিতর। মন্দিরের ভিতর তিনধাপ সিঁড়ি দিয়ে উঠে বাঁধানো উঁচু চাতালের ওপর মা হিংলাজ এবং ভৈরব। চাতালের নীচে পাহাড়ের ভেতর প্রায় ত্রিশ ফুটের একটি অর্ধচন্দ্রাকার গুহার দুই মুখ। এক মুখ দিয়ে ঢুকে অন্যমুখ দিয়ে বেরিয়ে আসার নিয়ম। বিশ্বাস তাতে পাপমুক্ত হওয়া যায়। এই মন্দিরে এসেছিলেন স্বয়ং শ্রী রামচন্দ্র। এসেছেন নানক, কবিরের মত মহান প্রাণেরা।
কাছেই রয়েছে পৃথিবীর সবথেকে বড় জীবন্ত মাড ভলকানো চন্দ্রগুপ। এটি চন্দ্রবাবার কুণ্ড নামেও পরিচিত। এরপরেই রয়েছে রানি মাড ভলকানো। দুটিই এখনও জীবন্ত। তরল কাদা টগবগ করে ফুটছে। ভূ-জঠর থেকে অবরত বেরিয়ে আসছে হাইড্রোজেন সালফাইড গ্যাস। ১৯৭৪ সালের প্রোটোকল অনুযায়ী এই মন্দিরটি পাকিস্তান সরকার অনুমোদিত তীর্থস্থানের তালিকায় নেই。ভারতীয় পাসপোর্টে পাকিস্তানি 'পিলগ্রিম ভিসা' পাওয়াও অত্যন্ত কঠিন। তা সত্ত্বেও বলতে হবে। যদি কোনও দিন হিংলাজ মাতার মন্দির দর্শনের সৌভাগ্য হয়। বালোচদের আথিতেয়তাও মনে থাকবে আজীবন।