মধ্যপ্রদেশ ভ্রমণের আইডিয়া গরমকালে না করাই ভালো। দীপ একথা আগেই বলে দিয়েছিল। সুতরাং মধ্যপ্রদেশ যদি ঘুরতে যেতে হয় তাহলে বেছে নিতে হবে শীতকালের সময়টাকে। তাই ডিসেম্বরের শুরুতেই তালুকদার ফ্যামিলি ঘুরে এল জব্বলপুর থেকে। নর্মদার তীরে এই শহরটি কিন্তু রূপে গুণে নজরকাড়া। জব্বলপুরের নাম নিয়ে দীপ একটা নাতিদীর্ঘ স্পিচ দিয়ে রেখেছে আগেই। অনেকে মনে করেন আরবি জব্বল শব্দ থেকে জব্বলপুরের নাম। জব্বল অর্থ পাথর। আবার অনেকে মনে করেন ঋষি জাবালির তপক্ষেত্র হিসেবে এই স্থানের নাম জব্বলপুর। হাওড়া থেকে শক্তিপুঞ্জ এক্সপ্রেস ছাড়ে দুপুর একটা দশ মিনিটে। জব্বলপুর পৌঁছয় পরের দিন আড়াইটে নাগাদ। ট্রেন লেট করলে অবশ্য আলাদা কথা। মেয়ে-জামাই সহ তালুকদার দম্পতি অবশ্য সঠিক সময়েই জব্বলপুর পৌঁছে গিয়েছিলেন। জব্বলপুর ভ্রমণ মানে দুমনা নেচার রিজার্ভ পার্ক, ধুন্ধর জলপ্রপাত, ভেদাঘাট মার্বেল শিলা, সংগ্রাম সাগর লেক, তিলওয়াড়া ঘাট, বর্গী ড্যাম, ব্যালেন্সিং রক ইত্যাদি ইত্যাদি ইত্যাদি।
জব্বলপুর থেকে দশ কিলোমিটার দূরে খান্ডারি বাঁধের কাছে ১০০০ হেক্টরের বেশি জায়গা জুড়ে দুমনা নেচার রিজার্ভ পার্ক। চিতল, বুনো শুয়োর, সজারু, হাজার রকমের পাখি নিয়ে ভারী মনোরম এই জায়গা। ৩০ মিটার ওপর থেকে নর্মদার প্রবল জলরাশি যখন পাথুরে জমি ছোঁয়, তৈরি হয় প্রবল বাষ্প। ধুঁয়া মানে বাষ্প আর ধর হল প্রবাহ। জব্বলপুরের বিখ্যাত এই জলপ্রপাতের নাম ধুঁয়াধর। কাছেই রয়েছে একটি রোপওয়ে। পাখির চোখে জলপ্রপাত। মোবাইলের অজস্র খিচিকেও আঁশ মেটে না।
কাছেই ভেড়াঘাটে রয়েছে মার্বেল রক। বাদশা খানের অশোক কিংবা হৃতিক রোশনের মহেঞ্জোদারো, শুটিং হয়েছিল এখানেই। নর্মদার গিরিখাতের গোটাটাই কোথাও দুধসাদা, কোথাও বা গোলাপি কোথাও হলুদের ছোঁয়া। পাথরের ওপর তখন বিকেলের সূর্যের কুসুম আভা। নৌ বিহার করছেন তালুকদার দম্পতি। জামাইদের জন্য আলাগা নৌকা। একটু প্রাইভেসি, এতটুকুই তো চাওয়া। অনেকদিন পর পঞ্চানন্দ তালুকদার নিজের গিন্নিকে দেখলেন, প্রথমবার কনে দেখা আলোয় যেমনটি দেখেছিলেন।
মার্বেল রকের সামনেই নর্মদা নদীর ধারে তিলওয়ারা ঘাট। ঘাটের চারপাশে অসংখ্য মন্দির। এখানেই মহাত্মা গান্ধীর ভস্ম নর্মদা নদীতে বিসর্জন দেওয়া হয়েছিল। বিশাল এই প্রকৃতি। তার খেলার কতটাই বা আমরা বুঝতে পারি ব্যালেন্সিং রকের সামনে দাঁড়িয়ে রীতিমত দার্শনিক হয়ে গেলেন পঞ্চানন্দ তালুকদার। দুটি বিশাল শিলা একে অপরের ওপর দাঁড়িয়ে এক অবাক ব্যালেন্সে। লক্ষ লক্ষ বছর আগে অগ্নুৎপাতের ফলে সৃষ্ট এই দুই পাথর যেন মাধ্যাকর্ষণকে চ্যালেঞ্জ করেছে।
জব্বলপুরের পিসানহারি কি মাদিয়া একটি জৈন তীর্থস্থান। মূল মন্দিরটি তৈরি হয়েছিল ১৪৪২ খ্রিষ্টাব্দে। পিসানহারি শব্দটি পেষণকারী থেকে এসেছে বলে মনে করা হয়। কথিত আছে স্থানীয় এক মহিলা গম গুঁড়ো করে এই মন্দিরের টাকা জোগার করেছিলেন। এটি জৈন ধর্মের দিগম্বরা শাখা দ্বারা পরিচালিত। প্রতিদিনই অসংখ্য তীর্থযাত্রী আসেন এই মন্দিরে। জব্বলপুরে জৈনদের প্রাধান্য ছিল। এখানে রয়েছে অত্যাশ্চর্য আদিনাথ ভগবানের মূর্তি। এটি পরিচিত বড় মন্দির নামেও। পিচকালো পাথরের তৈরি এই মূর্তিও ভরসার যোগায় স্থানীয় মানুষদের।
হাতে সময় থাকলে দেখে নিতে পারেন রানি দুর্গাবতীর দুর্গ। দুর্গাবতী রাজ্যের স্বাধীনতা বজায় রাখতে লড়াই করেছিলেন মোগলদের সঙ্গে। রানির প্রায় অভেদ্য দুর্গের নাম মদন মহল। জব্বলপুরে রানি দুর্গাবতীর স্মরণে তৈরি মিউজিয়ামও রয়েছে। এখান থেকে দু দিন সময় হাতে নিয়ে ঘুরে আসতেই পারেন বান্ধবগড় অভয়ারণ্য। পঞ্চানন্দ তালুকদারের মেয়ে-জামাই দুজনেই রয়েছে আইটি সেক্টরে। ছুটি কোথায়। তাই এবার আর বান্ধবগড়ে যাওয়া হয়নি।