এককালে হাতিশালে হাতি ছিল, ঘোড়াশালে ঘোড়া। রাজকন্যের বিয়েতে একশ পদ রান্না হত। আকাশ জুড়ে আতশবাজি পুড়ত রাজপুত্তুরের অন্নপ্রাসনে। আজ সেসব কিছু হয় না। রাজার বিয়ের কথা বলে বৈভবের ব্যাখ্যা দেয় পুরানো মানুষরা। কিন্তু সে রাজাও নেই সে রাজপাটও নেই। পুরানো বাড়ি গুলি পড়ে আছে ইতিহাসের খোলা পাতার মত। তবে এখন ভাবনাটা একটু বদলেছে। যে রাজবাড়ির অবস্থা ততটা খারাপ নয়, সেই রাজবাড়ি গুলির একাংশ কিংবা গোটাটাই সাজিয়ে গুছিয়ে খুলে দেওয়া হয়েছে পর্যটকদের জন্য। তারা এখন গোটা দিনরাত কাটাতে পারেন এই রাজবাড়ি গুলিতে। করতে পারেন রাজকীয় খাওয়াদাওয়া। খরচা কোনওটা বা বাজেট ফ্রেন্ডলি, কোনওটায় থাকতে গেলে বেশ কিছুটা রেস্তো খসাতে হয়।
বাওয়ালি রাজবাড়ি
কলকাতা থেকে মাত্র ৩০-৩৫ কিলোমিটার দূরে বজবজে অবস্থিত বাওয়ালি রাজবাড়ি তৈরি হয়েছিল মণ্ডল পরিবারের হাতে। রাজারাম মণ্ডল ছিলেন হিজলির রাজার সেনাপতি। রাজাকে খুশি করে পেয়েছিলেন ৫০ বিঘা জমি আর বিস্তর ধনদৌলত। তাঁর হাতেই গড়ে ওঠে এই রাজবাড়ি। এরপর ঐশ্বর্য চলে গেলেও রয়ে গেল বিশাল এই রাজবাড়ি। দীর্ঘদিন পর এই বসতবাড়ি রূপ নেয় হেরিটেজ রিসর্টের। ঢোকার মুখে বড় বড় সিঁড়ি, কারুকাজ করা বিশাল বিশাল থাম। ফুটবল মাঠের মত উঠান। এক লহমায় আপনি চলে যাবেন ইতিহাসে। বাড়ির কোনায় কোনায় রাজকীয় মেজাজ। এই রাজবাড়িতেকাটাতে পারেন আপনার উইক-এন্ড। অনেক কিছু দেখার আছে বাওয়ালিতে। রয়েছে পোড়ামাটির কাজ করা গোপীনাথ মন্দির, রয়েছে রাধামাধব মন্দির। হ্রদের মাঝে রাজারা তৈরি করেছিলেন গ্রীষ্মাবাস, দেখতে পারেন সেই জলটুঙ্গিও। একদিনের রাজা হতে গেলে আপনাকে খরচ করতে হবে সাত দশ হাজার। রাজার খাবার, রাজার পালঙ্কে শোবার ইচ্ছেতো আর সবার পূরণ হয় না, সেই সুযোগ দিচ্ছে বাওয়ালি রাজবাড়ি।
ঝাড়গ্রাম রাজবাড়ি
পশ্চিমবঙ্গের ট্রাভেল ডেস্টিনেশ হিসেবে ঝাড়গ্রামের নাম প্রায় প্রত্যেক বাঙালিরই মনে আসে। ঝাড়গ্রামে ঘুরতে যাবেন চিল্কিগড়ের কনকদুর্গা মন্দির দেখবেন, পাশাপাশি দেখবেন চিল্কিগড়ের রাজবাড়িও। এতদিন পর্যটকরা বাইরে থেকেই রাজবাড়ি দর্শন করে ফিরে যেতেন। এবার রাজবাড়ির অন্দরমহলেও ঢুকতে পারবেন আপনি। শুধু তাই নয় রাত্রিবাসও করতে পারবেন। তিনশ বছরের রাজবাড়িতে রাত কাটাতে খরচ মাত্র আটশ টাকা। পাঁচটি ঘর নিয়ে তৈরি হয়েছে হেরিটেজ চিল্কিগড় রাজপ্যালেস। রুমগুলির খুব একটা পরিবর্তন করা হয়নি। পর্যটকরা প্রাচীন রাজবাড়ির ঐতিহ্য এবং ইতিহাসকে অনুভব করতে পারবেন। রাজবাড়িতে রাত কাটিয়ে পায়ে পায়ে ডুলুং নদী। নদী পরিয়ে কনকদুর্গা মন্দিরে পুজোও দিতে পারবেন পর্যটকরা। এখান থেকেই ঘুরে আসতে পারবেন বেলপাহাড়ির বিভিন্ন ট্যুরিস্ট স্পট।
ইটাচুনা রাজবাড়ি
এই রাজবাড়ি পরিচিত বর্গীদের বাড়ি হিসেবে। গোটা এলাকার নাম হয় বর্গীডাঙা। বর্গী হানাদারদের কেউ কেউ বাংলার ধনসম্পদ লুঠ করে এখানেই বসবাস শুরু করেন, ইটাচুনার কুন্দ্রারা তারই উদাহরণ। এই কুন্দ্রারাই পরে হয় কুণ্ডু। এই কুণ্ডুরাই ১৭৬৬ খ্রিষ্টাব্দে এই রাজবাড়ি তৈরি করেন। রাজবাড়ি ঘিরে মাইলের পর মাইল সবুজে মোড়া চাষের জমি। রাজবাড়ির গেট ছাড়িয়ে এক কেমন যেন গা শিরশিরানি অনুভূতি। পুরানো দেওয়ালে পলেস্তারা ঘসে জন্ম দিয়েছে অজানা মানচিত্রের। উঁচু কড়িবরগার ছাদ, আলপনা দেওয়া বিরাট নাটমন্দির। ঝাড়বাতি দিয়ে সাজানো বিশাল বৈঠকখানা আপনাকে অন্য জগতে নিয়ে যাবে। সোনাক্ষী সিংহ আর রণবীর সিংহের ‘লুটেরা’ ছবির শুটিং হয়েছিল এই বাড়িতেই । বাড়ির সবই প্রাচীন। বহু পুরনো আসবাবপত্র, বিরাট সিন্দুক,কারুকার্যমণ্ডিত পালঙ্ক সবই সাবেক । খিড়কির পুকুরে নুয়ে পড়া গাছ— সবই বড় মায়াবী, মন কেমন করা। রাতের দিকে এক বাঁশুরিয়া পাশের গ্রাম থেকে বাঁশি বাজাতে আসেন রাজবাড়িতে। তাঁর বাঁশির সুর ঘুরে বেড়ায় রাজবাড়ির আনাচে কানাচে। রুম ভাড়া শুরু ৩ হাজার থেকে। খাওয়ার খরচা আলাদা। একদিনের ছুটির দিনে একটু নিরিবিলিতে কাটাতে ইটাচুনা রাজবাড়ি লা জবাব।