ঈষৎ পৃথুলা টুলটুল বৌদি মাথায় ফুলের মুকুট পড়ে চন্দ্রমল্লিকা কাননে ফুল কুমারি হয়ে পোজ দিচ্ছেন আর পঞ্চানন্দ তালুকদার বিভিন্ন ভাবে শরীর বেঁকিয়ে প্রায় মাটিতে শুয়ে টুলটুল বৌদির ছবি তুলে যাচ্ছেন নিজের মোবাইলে। মুখ বইয়ের দেওয়ালে লেখা হবে 'যদি ভালোবাসো প্রিয়, হাস্নুহানার গন্ধ দিয়ে আমায় ভরিয়ে দিও।' লেখাটা আগে থেকেই ঠিক করে রাখা আছে। মানানসই একটা ছবি হলেই ব্যাস। যতদূর চোখ যায় শুধু ফুল আর ফুল। গাঁদা, চন্দ্রমল্লিকা, স্নোবল, ডালিয়া, জিনিয়া, কসমস। কাশ্মীরের কার্পেট দেখেছেন? হাজার রঙ, মোলায়েম স্পর্শ। এ যেন ঠিক তেমনই।
শীতকাল এসে গেছে আর আপনি ফুল ভালোবাসেন। পঞ্চানন্দ তালুকদার আর টুলটুল বৌদির মত বেড়িয়ে পড়ুন ফুলের গালিচায়। আপনার পাসপোর্ট,ভিসা, আধার কার্ড, ভোটার কার্ড, ইন্টারন্যাশনাল ডেবিট কার্ড গুছিয়ে নিন। সবকিছু তুলে রাখুন আলমারিতে। এসব কিছুই লাগবে না। আগে থেকে টিকিট কাটার ও ঝামেলা নেই। রিজার্ভেশন লাগবে না। হাওড়া থেকে খড়গপুর, মেদিনীপুর যেকোনও লোকালে চড়ে বসুন। আপনার গন্তব্য পূর্ব মেদিনীপুরের ক্ষীরাই। পাঁশকুড়ার ঠিক পরের স্টেশন। সকালে আপের লোকাল ফাঁকা। জানলার ধারে বসে পড়ুন দুজনে। বহুদিন বাদে এরকম সাদামাটা একটি ভ্রমণ করছেন। ট্রেনে মাটির ভাড়ে চা আর ঝালমুড়ি খেতে ভুলবেন না। দেড়ঘণ্টা আর এমন কী? ক্ষীরাই পৌঁছে যাবেন।
স্টেশনে নেমে দেখবেন বাইরে গাড়ি, টোটো দাঁড়িয়ে আছেন। দাম করার আগে একটা কথা মাথায় রাখবেন হেঁটে যেতে কুড়ি মিনিটের বেশী লাগবে না। যাইহোক সকলের সঙ্গে উঠে পড়ুন একটা কিছুতে। পৌছে যাবেন পূর্বমেদিনীপুরের স্বর্গোদ্যানে। কয়েক বছর আগেও কেউ জানত না। স্থানীয় চাষিরা ফুলের চাষ করত। সেই ফুল আসত জগন্নাথ ঘাট সহ বিভিন্ন বাজারে। কিন্তু এখন এই চাষের ক্ষেতই একটা মিনি পর্যটন ক্ষেত্র। ক্ষেতে ঢোকার আগে একটা ছোট মাঠ। পাশেই বয়ে যাচ্ছে একটা ছোট খাল। মাঠেই রয়েছে বেশ কিছু গ্রাম্য স্টল। চা বিস্কুট, বরফ গোলা, পাউরুটির টোস্ট, বিভিন্ন গাছ আর ফুলের মুকুট বিক্রি হচ্ছে। এখান থেকেই টুলটুল বৌদি মাথার মুকুট টা কিনেছেন। এবার ঢুকে পড়ুন ফুলের ক্ষেতে। আলপথ দিয়ে হাঁটতে থাকবেন দুপাশে যতদূর চোখ যায় শুধু ফুল আর ফুল। চাষীদের দেখে একটা বিষয় পরিস্কার, এত মানুষ এসে তাদের কাজের কোনও ক্ষতি করছেন না। বরং এলাকাটা একটা পর্যটন ক্ষেত্র হয়ে ওঠায় ফুল এবং গাছ বিক্রি করে আয় বেশিই হচ্ছে।
দু তিন ঘণ্টা ঘুরে বেড়ান। টিফিন বক্সে করে স্যানডুইচ নিয়ে গিয়েছিলেন টুলটুল বৌদি। দুজনে তা সাবার করে এক পেট জল খেয়ে নিলেন। রোদের তেজ একটা সময় পড়ে আসবে। এবার ফেরার পালা। ফেরার সময় আর গাড়ি নেবেন না। সেই তো বাড়ি গিয়ে শাশুড়ি বৌমার সিরিয়াল। এত তাড়া কিসের। আপনার বাঁ দিক দিয়ে সূর্য অস্ত যাচ্ছে । আপনি গ্রামের মেঠো পথ দিয়ে হাঁটতে থাকুন। একটু ধুলো উড়ছে। আপনার বডি লোশনের সঙ্গে খুব একটা মানানসই নয় বটে, তবে ফাঁকা মাঠের ওপারে যেখানে নারকোল গাছগুলি সূর্যের গায়ে হাত বুলিয়ে দিচ্ছে , যেখানে দুটো চিল আকাশে এঁকে দিচ্ছে একটা বৃত্ত। সেখানকার ছবি বুকে এঁকে একটা বড় শ্বাস নিন। অস্তমিত সূর্য আপনাকে অনেক কিছু বলে দেবে।