অসীম সেন: ছেলেটার এলেম আছে। এতদিন ধরে কলকাতায় আছি, এসব জায়গায় ঘোরার কথা মনে আসেনি কখনও। পঞ্চানন্দ তালুকদারের বৈঠকখানাকে চির বসন্তের আসর বলা যেতেই পারে। আটান্ন বছরের পঞ্চানন্দ বাবু, বাহান্নর টুলটুল বৌদি, চব্বিশের ঋদ্ধি, আর একুশের দীপু। ঋদ্ধি টুলটুল বৌদির ছোট বোনের মেয়ে। জামসেদপুর থেকে এসেছে। টুলটুল বৌদির অনুরোধে তাকে নিয়েই কলকাতা ঘুরতে গিয়েছিল দীপু। কলকাতা মানে ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল, প্রিন্সেপ ঘাট, কালীঘাট, ইকো পার্ক, কিংবা গড়ের মাঠ। এছাড়াও কলকাতা রয়েছে কালী দা।
মানিকতলা থেকে এগিয়ে গৌরীবাড়ির কাছে বদ্রিদাস টেম্পল স্ট্রিটে রয়েছে শতাব্দীপ্রাচীন জৈন মন্দির। ১৮৬৭ সালে বদ্রিদাস বাহাদুর মুকিম মন্দিরটি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন জৈন তীর্থঙ্কর পার্শ্বনাথের স্মরণে। লর্ড মেয়ো তাঁকে রায়বাহাদুর উপাধিতে ভূষিত করেন। গোটা মন্দির সাজানো বেলজিয়াম কাঁচ আর রাজস্থানের মার্বেল দিয়ে। একসঙ্গে চারটি মন্দির। মূল মন্দির শীতলনাথজির। ডান পাশে চন্দ্রপ্রভুজির মন্দির পাসেই দাদাওয়াড়ি ও মহাবীর স্বামীর মন্দির। মূল ফটক পেরিয়ে ভিতরে ঢুকতেই আলাদা জগত। ভিতরে সাজানো ফোয়ারা, বাগান, মারবেলের অপরূপ কারুকাজ। জলাশয়ে খেলছে মাছ। আয়নাখচিত শীতলনাথজির মন্দির যেন রাজস্থানের কোনও এক শিশমহল।
জোড়াসাঁকোর কাছে মুক্তারাম বাবু স্ট্রিটে রয়েছে মার্বেল প্যালেস। চারিদিকে বাগান। যেন সবুজ মখমল দিয়ে ঢাকা। মার্বেল প্যালেসের চিড়িয়াখানায় দেখা মিলবে রকমারি পাখি আর হরিণের। ১৮৩৫ সালে রাজা রাজেন্দ্র মল্লিক এই প্রাসাদটি তৈরি করেন। নব্বইটি বিভিন্ন ধরণের মার্বেল পাথর ব্যবহৃত হয়েছে এই প্রাসাদ নির্মাণে। শিল্পমনা রাজেন্দ্র মল্লিক রুবেনস বা রেনল্ডসের মতো বিখ্যাত চিত্রশিল্পীদের মূল পেইন্টিং, ঝাড়বাতি, রোমান ভাস্কর্য এবং ঘড়ি সংগ্রহ করে এই প্রাসাদটিকে একটি ব্যক্তিগত জাদুঘরের রূপ দেন।
ক্যানিং স্ট্রিট ও ব্র্যাবোন রোডের সংযোগস্থলে রয়েছে ইহুদিদের উপাসনাগৃহ মাগেন ডেভিড সিনাগগ। মাগেন ডেভিড শব্দের অর্থ ডেভিডের ঢাল। এটি এশিয়ার বৃহত্তম সিনাগগ গুলির একটি। শালম আহারন ওবাদিয়াহ কোহেন ছিলেন কলকাতার প্রথম ইহুদি বাসিন্দা। পরে সম্প্রদায়টি বড় হতে থাকলে ১৮৮৪ সালে ইলিয়াস ডেভিড জোসেফ এজরা এই সিনাগগটি তৈরি করেন। সেই সময়ে এটি তৈরি করতে খরচ হয়েছিল প্রায় দু লক্ষ টাকা। চারিপাশে রঙিন কাচের টুকরো। কাচ দিয়ে সূর্যের নানা রঙ গোটা সিনাগগটিকে মায়াময় করে তোলে। এছাড়াও মল্লিকদের গঙ্গাঘাটে আলুকাবলি খাইয়েছে ঋদ্ধিকে। বড়বাজারে গিয়ে দুজনে মিলে কচুরি খেয়েছে। এর আগেও ঋদ্ধি কলকাতা এসেছে। পঞ্চানন্দ বাবু অফিস ছুটি নিয়ে চিরিয়াখানায় নিয়ে গিয়েছিলেন শালির মেয়েকে। কিন্তু আজকে বুঝছেন, সেদিন তিনি ঋদ্ধিকে কলকাতা দেখাতে পারেননি।