ক্যারমেই বাজিটা ধরা হয়েছিল। হেরে গেলে ট্যুরের হোটেল আর গাড়ি খরচা দিতে হবে। অসীম-বিজয় একদিকে, অন্যদিকে আশিষ -রানা। দশবার খেলা হলে ন বার চোখ বুঝে রানারা জিতবে। তাও চেগে চৌত্রিশ হয়ে মিছি মিছি বেট এবং যা ফল হওয়ার তাই হল। চারজনের মধ্যে দুজনের ভরসা টিউশন, আশিষটা লেখাপড়া করে একমাত্র বিজয় মেডিকেল রিপ্রেজেনটিভ এর চাকরি পেয়েছে সদ্য। কোথায় যাওয়া যেতে পারে?
শীতের দিনে বরফ দেখার সাধ কোন বাঙালির না হয়ে থাকে। তা বলে কাশ্মীর যাওয়ার ভাগ্য তো আর সবার থাকে না। খুঁজতে খুঁজতে মিলল ইয়াংইয়াং এর নাম। এখানে একটা কথা বলে রাখা ভালো। গুগুল আঙ্কেল জায়গাটার নাম ইয়াঙ্গাং অথবা ইয়াংগাং বললেও স্থানীয় ভাষায় কিন্তু জায়গাটার নাম ইয়াং ইয়াং। যাইহোক হঠাৎ করে এই মরশুমে টিকিট পাওয়ার অসুবিধা রয়েছে। তাই প্ল্যান করলে আগে থেকে টিকিট কাটাই ভালো। সাধারণত সকলে এনজিপি স্টেশন পছন্দ করেন। কিন্তু শিলিগুড়ি স্টেশন থেকে রওনা দিলে অন্তত আধঘণ্টা সময় বাঁচে।
সিকিমের নামচি জেলায় লুকিয়ে এই অফবিট স্পট। শিলিগুড়ি থেকে দূরত্ব কমবেশি চার ঘণ্টা। স্লো ট্যুরিজম এর অংশ এই পাহাড়ি গ্রাম। মানে দিন রাত ছুটোছুটির দরকার নেই। সকালের নরম রোদ গায়ে মেখে চেরি বাগানে ঘুরে বেড়ান। কিংবা নিজেকে হারিয়ে ফেলুন মেনাম জঙ্গলে। চার মাথা একসঙ্গে হলে কলম্বাসের ভূত চাপে। একটু শুকনো খাবার সঙ্গে নিয়ে অসীমরা হারিয়ে গিয়েছিল মেনাম ভালেধুঙ্গার জঙ্গলে। কুয়াশা গলে হিরের মত ঝকমক করে মাকড়শার জালে। দূরে হিমালয় যেন কুহকিনী। সে ডাক ফেরানোর সাধ্যি নেই। পাহাড়ি রাস্তায় ট্রেকিং করতে করতে জ্যাকেটের চেন টা খুলে দিল পল্লি উন্নয়ন সমিতির ফুটবল স্টার রানা। যথেষ্ট হাফ ধরেছে। জঙ্গলের মধ্যে একটি পাথরের ওপর চার মক্কেল মেওনিজ মাখানো পাউরুটি খেল ডিমসিদ্ধ সহযোগে। একটা ফ্লাক্স আর কফিপাতা আনলে ষোল আনা পূর্ণ হত।
ইয়াংইয়াং এর কাছেই সিকিমের একমাত্র চা বাগান মিম টি গার্ডেন। পাহাড়ের ধাপ কেটে চা বাগানে সব তিতো মিঠা হয়ে যায়। মেটেরিয়া মেডিকার কাব্য পড়লেও ক্ষতি নেই, ফার্মাকোলজিও মনে হয় কালিদাসের মেঘদূত। একদিন ঘুরে আসতে পারেন চা লেকের ধারে। পাহাড় যেন পদ্মাসনে বসে আছে ধ্যানমগ্ন ঋষির মত। তার কোলের ওপর পদ্মফুলের মত এলিয়ে আছে সবুজ নীলে পাহাড়ি হ্রদটা। এর পাড়ে বসে শুধু নিস্তব্ধতার কোরাস গান শুনতে হয়। এই তো জীবন কালী দা। ইয়াংইয়াং এ বৌদ্ধদের প্রভাব স্পষ্ট। এখানে রয়েছে একটি প্রাচীন বৌদ্ধ মঠ। প্রার্থনা পতাকা এবং জলদ গম্ভীর প্রার্থনা মন্ত্র এক অন্য পরিবেশ তৈরি করে।
পাহাড় কেটে আঁকাবাকা রাস্তা গুলি দূর থেকে অনেকটা প্রেমিকার মাথার সিতের মত। শিলিগুড়ি থেকে ইয়াংগাং এর দূরত্ব ১১১ কিলোমিটার। জাতীয় সড়ক দিয়ে চলতে চলতে সময় লাগে চার থেকে পাঁচ ঘণ্টা। আর একটা দরকারি কথা না বললেই নয়। হাই অলটিচিউড এ শ্বাস কষ্ট রুখতে কোকা ৩০ আর ট্রাভেল এর অস্বস্তি কাটাতে অনডেম সঙ্গে নেবেন। সঙ্গে রাখবেন পপকর্ন এবং চকোলেট। চার মক্কেলের পাহাড় ভ্রমণ ফুরালো নটে গাছটি মুড়লো। ফিরে এসে কয়েকদিন কেমন যেন আনমনা। পাহাড়ের হ্যাংওভার কাটতে সময় লাগে।