Calcutta Television Network

এক পা ভারতে, অন্য পা মায়ানমারে! লংওয়ার এই বাড়ির গল্প অবাক করবে

এক পা ভারতে, অন্য পা মায়ানমারে! লংওয়ার এই বাড়ির গল্প অবাক করবে
6 October 2026 03:23:32 pm

একটি বাড়ি। যার এক দিকে ভারত, অন্য দিকে মায়ানমার। ঘুম থেকে উঠে এক দেশে, আর কয়েক পা এগিয়েই ভিন্ন দেশে! শুনতে খানিক অবাক লাগলেও এমনই বাস্তবতা নাগাল্যান্ডের মন জেলার লংওয়া গ্রামে। আন্তর্জাতিক সীমান্ত যেন গ্রামের জীবনকেই ভাগ করে দিয়েছে দু’ভাগে। আর এই গ্রামের সবচেয়ে আকর্ষণীয় বিষয়গুলির মধ্যে অন্যতম হল কোনিয়াক নাগা উপজাতির প্রধান ‘অ্যাং’-এর বাড়ি। লংওয়া পাহাড়ঘেরা একটি সুন্দর গ্রাম। প্রকৃতির টানে পর্যটকেরা এখানে এলেও গ্রামের ইতিহাস ও সংস্কৃতিরও আকর্ষণ আদপেই কম নয়। কোনিয়াক নাগাদের জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে বহু পুরনো রীতি, যুদ্ধের ইতিহাস এবং নানা ঐতিহ্য। গ্রামের অ্যাংদের বাড়িটি সেই ইতিহাসেরই অন্যতম নিদর্শন। বাড়িটির অবস্থানই একে অন্য রকম করে তুলেছে। বাড়ির প্রবেশপথের একটি অংশ রয়েছে ভারতের দিকে, অন্য অংশ মায়ানমারের দিকে। এমনকি বাড়ির ঘরগুলির অবস্থানও দুই দেশের মধ্যে দিব্যি বিভক্ত হয়ে টিকে রয়েছে। শোওয়ার ঘর ভারতের দিকে, আর খাবার ঘর মায়ানমারে। ফলে একই বাড়ির বাসিন্দারাই কার্যত দুই দেশের সীমানার মধ্যে জীবন কাটান। একসময় কোনিয়াক নাগাদের অ্যাংদের প্রভাব বর্তমানের তুলনায় অনেকাংশে অধিক ছিল। ভারতের কয়েকটি গ্রাম এবং মায়ানমারের বহু নাগা গ্রামের উপর তাঁদের কর্তৃত্ব বজায় ছিল।

বর্তমানে লংওয়ার অ্যাং-এর অধীনে ভারত ও মায়ানমার মিলিয়ে বেশ কয়েকটি গ্রাম রয়েছে। সীমান্তের দুই দিকের বাসিন্দাদের মধ্যে পারিবারিক ও সামাজিক যোগাযোগ আজও বিদ্যমান। এমনকি দুই দেশের গ্রামের পড়ুয়ারা একই স্কুলে পড়াশোনাও করে চলেছে। তবে সীমান্ত পরিস্থিতি কিন্তু আগের মতো সহজ নেই। নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও কড়া হওয়ায় ভারত-মায়ানমারের মধ্যে যাতায়াতে এখন নিয়ম মানতে হয়। নির্দিষ্ট জায়গা দিয়েই সীমান্ত পার হওয়ার সুযোগ রয়েছে। ফলে একই এলাকার মানুষ হলেও দুই দেশের মধ্যে চলাচলের ক্ষেত্রে তৈরি হয়েছে বেশ কিছু বিধিনিষেধ। লংওয়ার সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে কোনিয়াকদের ভয়ঙ্কর অতীতও। একসময় বিভিন্ন নাগা গ্রামের মধ্যে জমি ও সীমানা নিয়ে সংঘর্ষের খবর আসত। সেই লড়াইয়ে শত্রুর মাথা কেটে আনার ঘটনাও ঘটেছে অহরহ। যোদ্ধাদের সেই কৃতিত্বকে বিশেষ মর্যাদা দেওয়া হত। মুখ ও শরীরে আঁকা কালির উল্কি ছিল সেই সময়ের যুদ্ধজীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ চিহ্ন। আজও সেই প্রজন্মের কয়েকজন প্রবীণ মানুষকে লংওয়ায় দেখতে পাওয়া যায়। তাঁদের পোশাক, অলঙ্কার এবং শরীরের উল্কিতে ধরা পড়ে অতীতের সেই প্রাচীন দিনলিপি। তবে সময়ের সঙ্গে বদলেছে তাঁদের জীবনযাপন। বর্তমানে বহু পরিবার কৃষিকাজের সঙ্গে যুক্ত। কেউ কাঠের কাজ করেন, আবার কেউ বিভিন্ন ধরনের হস্তশিল্প তৈরি করে জীবিকা চালান। ধাতুর তৈরি নানা সামগ্রী এবং যোদ্ধাদের মূর্তিও স্থানীয় শিল্পীদের হাতে নির্মিত হয়। কোনিয়াক সমাজে ‘মোরুং’-এরও বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। এটি শুধু একটি ঘর নয়, বরং স্থানীয় শিক্ষা, সংস্কৃতি ও সামাজিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্র। গ্রামের গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকও এই স্থানেই বসে। মোরুংয়ের সঙ্গে যুক্ত রয়েছে বড় কাঠের গুঁড়ি দিয়ে তৈরি ‘খং’ নামের এক ধরনের বাদ্যযন্ত্র। অতীতে বিপদের খবর দিতে এই কাঠের বাদ্যযন্ত্র বাজানো হত। নির্দিষ্ট তাল ও শব্দের মাধ্যমে দেওয়া হত নানা ধরণের সংকেত। লংওয়া ঘুরতে গেলে সীমান্তের জ়িরো পয়েন্টও দৃশ্যমান হয়। বিকেলের দিকে পাহাড় ও উপত্যকার দৃশ্য পর্যটকদের কাছে বেশ আকর্ষণের। মন জেলা সদর থেকে সড়কপথে লংওয়ার দূরত্ব প্রায় ৪০ থেকে ৪৫ কিলোমিটার। গ্রামে বড় কোনো হোটেল নেই। কয়েকটি সাধারণ মানের হোমস্টেতে থাকার ব্যবস্থা রয়েছে শুধু। কোনিয়াকদের জীবন ও সংস্কৃতিকে কাছ থেকে দেখতে চাইলে সেখানে রাত কাটানো যায়। লংওয়ার কাছাকাছি যেতে হলে অসমের জোরহাট বিমানবন্দর ব্যবহার করা হয়। সড়কপথে সোনারি হয়ে মন পৌঁছনোর ব্যবস্থাও রয়েছে। সোনারি থেকে মন প্রায় ৬৫ কিলোমিটার দূরে। আবার সিমুলগুড়ি হয়েও মন যাওয়া যায়, সেই পথের দূরত্ব প্রায় ৯৫ কিলোমিটার।প্রকৃতি, সীমান্তের অদ্ভুত ভৌগোলিক অবস্থান এবং কোনিয়াক নাগাদের ইতিহাস, এই তিনের অভূতপূর্ব মেলবন্ধনেই লংওয়া ভারতের অন্য পর্যটনস্থলগুলির থেকে সম্পূর্ণ পৃথক করে তুলেছে।

×
  • CTVN