Calcutta Television Network

গ্রেট ওয়াল অফ ইন্ডিয়া

গ্রেট ওয়াল অফ ইন্ডিয়া
22 September 2026 04:29:19 pm

চিনের প্রাচীরের কথা জানেন বহু মানুষ। কিন্তু ভারতের মাটিতেও রয়েছে এমন এক সুদীর্ঘ প্রাচীর। সাথে জড়িয়ে আছে ইতিহাস, যুদ্ধ এবং নানা রহস্যময় লোককথা। রাজস্থানের আরাবল্লি পর্বতমালার বুকে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে থাকা কুম্ভলগড় দুর্গের প্রাচীরকে অনেকেই বলেন ‘গ্রেট ওয়াল অফ ইন্ডিয়া’। প্রায় ৩৬ কিলোমিটার দীর্ঘ। এই প্রাচীর বিশ্বের দীর্ঘতম অবিচ্ছিন্ন দুর্গপ্রাচীরগুলির অন্যতম। দৈর্ঘ্যের বিচারে অবশ্য চিনের প্রাচীরের সঙ্গে কুম্ভলগড়ের তুলনা চলে না। চিনের প্রাচীরের বিভিন্ন অংশ মিলিয়ে মোট দৈর্ঘ্য প্রায় ৮৮৫০ কিলোমিটারের কাছাকাছি। কিন্তু কুম্ভলগড়ের বিশেষত্ব অন্য জায়গায়। পাহাড়, উপত্যকা বা অন্য কোনও বড় প্রাকৃতিক বাধাকে প্রাচীরের গলদ হিসেবে রেখে দেওয়া হয়নি। অরাবল্লির ১৩টি পাহাড়চূড়াকে ঘিরে একটানা এগিয়েছে এই প্রতিরক্ষা স্থাপত্য। সেই কারণেই ‘অবিচ্ছিন্ন প্রাচীর’ হিসেবে কুম্ভলগড়ের গুরুত্ব ভিন্ন। চিনের প্রাচীরের কিছু অংশ অবশ্য কুম্ভলগড়ের প্রাচীরের চেয়েও দীর্ঘকায়। কিন্তু পুরো কাঠামোটিকে একটানা। একটি গোটা প্রাচীর।

প্রাচীরটির একটি বিস্ময়কর বৈশিষ্ট্য হল তার প্রস্থ। প্রচলিত তথ্য অনুযায়ী, এর উপর দিয়ে একসময় পাশাপাশি আটটি ঘোড়া চলতে পারত। অর্থাৎ এটি শুধুমাত্র একটি সীমানা দেওয়াল ছিল না। যুদ্ধের সময়ে সেনা চলাচল, নজরদারি এবং দুর্গ রক্ষার কাজেও এটি ব্যবহার করা যেত। প্রাচীরের বিবিধ অংশে ছিল শক্তিশালী প্রবেশপথ এবং প্রতিরক্ষার ব্যবস্থা। পাহাড়ের স্বাভাবিক উচ্চতার সঙ্গে মানব নির্মিত এই বিশাল কাঠামো মিলে কুম্ভলগড়কে এক সময় মেওয়ারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ঘাঁটি মনে করা হত। আজ যে দুর্গ ও প্রাচীর পর্যটকদের আকর্ষণ করে, তার নির্মাণের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে মেওয়ারের শাসক রানা কুম্ভের নামও। পঞ্চদশ শতকে তাঁর আমলে কুম্ভলগড় দুর্গের নির্মাণ ও সম্প্রসারণের কাজ শুরু হয়। ১৪৪৩ থেকে ১৪৫৮ সাল, প্রায় ১৫ বছর ধরে এই নির্মাণকাজ চলেছিল। কুম্ভলগড়ের গুরুত্ব শুধুমাত্র স্থাপত্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। যুদ্ধের সময় মেওয়ারের রাজপরিবারের জন্যও এটি গুরুত্বপূর্ণ আশ্রয়স্থল হয়ে ওঠে। মেওয়ারের শাসক উদয় সিংহও চিতোরের উপর আক্রমণকালে এই দুর্গে আশ্রয় নিয়েছিলেন। আরও একটি কারণে কুম্ভলগড়ের নাম রাজস্থানের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ। মহারানা প্রতাপের জন্মও এই দুর্গে। মেওয়ারের এই বিখ্যাত শাসক পরবর্তী সময়ে মুঘল সম্রাট আকবরের বিরুদ্ধে দীর্ঘ প্রতিরোধ গড়ে তোলেন।

কুম্ভলগড়ের প্রাচীরকে ঘিরে সবচেয়ে চমকপ্রদ গল্পটি অবশ্য তার নির্মাণের সমসাময়িক। স্থানীয় লোককথা অনুযায়ী, প্রাচীর তৈরির কাজ শুরু হওয়ার পর দিনের বেলায় শ্রমিকরা যতটা অংশ নির্মাণ করতেন, রাতের মধ্যে নাকি তা ভেঙে পড়ত। বারবার চেষ্টা করেও মজবুত ভিত্তি কিছুতেই তৈরি করা যাচ্ছিল না। সমস্যার সমাধান খুঁজতে শেষ পর্যন্ত রানা কুম্ভ এক সুফি সাধুর দ্বারস্থ হন। স্থানীয় কাহিনিতে তাঁর নাম মেহের বাবা বা মের বাবা বলে উল্লিখিত। গল্প অনুযায়ী, সাধু জানান, দুর্গ তৈরির জায়গাটিই নাকি অভিশপ্ত। সেই বাধা কাটাতে প্রয়োজন স্বেচ্ছায় আত্মবলিদান দেওয়া এক পবিত্র ব্যক্তির। স্বাভাবিক ভাবেই এমন শর্ত মেনে নেওয়ার মতো কাউকে খুঁজে পাওয়া যায়নি। শেষ পর্যন্ত ওই সাধুই নিজের জীবন উৎসর্গ করার সিদ্ধান্ত নেন। কাহিনির পরের অংশ আরও নাটকীয়। শোনা যায়, সাধু পাহাড়ের উপর দিয়ে হাঁটতে শুরু করেন এবং তাঁর পিছনে ছিলেন রানা কুম্ভ। সাধু যেখানে প্রথম থামবেন, সেখানে দুর্গের প্রবেশপথ তৈরির নির্দেশিকা দেন। লোকবিশ্বাস অনুযায়ী, সেই জায়গাতেই তৈরি হয় হনুমান পোল, যা কুম্ভলগড়ের অন্যতম প্রধান প্রবেশদ্বার। এর পর সাধু আরও অগ্রসর হয়ে দ্বিতীয় বার থামেন। সেখানে তাঁর শিরশ্ছেদ করার কথা ছিল। তাঁর কাটা মস্তক যেখানে পড়বে, সেখানে মন্দির এবং তাঁর দেহ যেখানে পতিত হবে, সেখান থেকে দুর্গের প্রাচীর নির্মাণ করার কাজ শুরু করার নির্দেশ দিয়েছিলেন তিনি।

স্থানীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, সাধুর আত্মবলিদানের পর থেকেই নির্মাণকার্য নির্বিঘ্নে এগোয়। যে প্রাচীর বার বার ভেঙে পড়ছিল, সেটিই পরবর্তীতে দাঁড়িয়ে যায় শতাব্দীর পর শতাব্দী। দুর্গের আশপাশে ওই সাধুর স্মৃতির সঙ্গে যুক্ত একটি মন্দিরও রয়েছে।

সাধুর আত্মবলিদান এবং তার সঙ্গে প্রাচীরের নির্মাণ সফল হওয়ার সরাসরি ঐতিহাসিক প্রমাণ নিয়ে নিশ্চিত কোনো তথ্য নেই। ফলে কুম্ভলগড়ের ইতিহাসের সঙ্গে এই কাহিনি কিংবদন্তি হিসেবেই বেশ পরিচিত। দুর্গের নিরাপত্তা ব্যবস্থাও ছিল খানিক অভিনব। প্রচলিত বিবরণ অনুযায়ী, রাতে প্রাচীরের বিভিন্ন জায়গায় বড়ো বড়ো মশাল জ্বালিয়ে রাখা হত। সেই মশাল জ্বালানোর জন্য বিপুল পরিমাণ ঘি ও তুলো ব্যবহার করা হত প্রতিদিন। প্রায় ৫০ কেজি ঘি এবং ১০০ কেজি তুলো প্রতিদিন মশালে ব্যবহার হত। মরুভূমির বিস্তীর্ণ এলাকা থেকেও সেই আলো দেখা যেত। মশালের এই ব্যবস্থা শুধুমাত্র আলো দেওয়ার জন্য নয়, দূর থেকে দুর্গের উপস্থিতি জানান দেওয়ার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ছিল। এত শক্তিশালী প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা থাকার পরও কুম্ভলগড় কিন্তু অজেয় থাকেনি। ১৫৬৮ সালে আকবরের বাহিনী কিছু সময়ের জন্য দুর্গের নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করে বলে ঐতিহাসিক সূত্রে জানা যায়। প্রচলিত বিবরণ অনুযায়ী, দুর্গের ভিতরে পানীয় জলের সমস্যা দেখা দেয়। তারপর দীর্ঘ সময় প্রতিরোধ চালানো কঠিন হয়ে পড়েছিল। পরে মেওয়ারের নিয়ন্ত্রণ আবার ফিরে আসে। মহারানা প্রতাপ মুঘলদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। ১৫৭৬ সালের হলদিঘাটির যুদ্ধ রাজপুত-মুঘল সংঘাতের অন্যতম পরিচিত অধ্যায় হলেও, যুদ্ধের ফলাফলকে শুধুমাত্র ‘মুঘলদের পরাজয়’ হিসেবে অতি সরলীকৃত করে ব্যাখ্যা নিয়ে ঐতিহাসিকদের মধ্যে মতপার্থক্য রয়েছে। যুদ্ধের পরও মহারানা প্রতাপের প্রতিরোধ অব্যাহত ছিল এবং মেওয়ারের বেশ কিছু অঞ্চল তিনি পরবর্তী সময়ে পুনরুদ্ধার করেন। তবে আজ কুম্ভলগড়ের প্রাচীর পর্যটকদের কাছে স্থাপত্যের এক অদ্ভুত বিস্ময়। কিন্তু এর গুরুত্ব শুধু ৩৬ কিলোমিটার দীর্ঘ একটি দেওয়াল হিসেবে উল্লেখ্য নয়। এটি মধ্যযুগীয় রাজস্থানের সামরিক পরিকল্পনা এবং মেওয়ারের রাজনৈতিক ইতিহাসের সঙ্গে গভীর ভাবে যুক্ত। অরাবল্লির দুর্গম ভূপ্রকৃতিকে ব্যবহার করে তৈরি এই বিশাল প্রাচীর একই সঙ্গে ছিল প্রতিরক্ষার পাশাপাশি ছিল রাজপরিবারের নিরাপদ আশ্রয় এবং মেওয়ারের সামরিক শক্তির নিশান। আর তার সঙ্গে আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে থাকা সাধুর আত্মবলিদানের গপ্পো, রাতের মশালের আলো কিংবা বার বার ভেঙে পড়া প্রাচীন কিংবদন্তি কুম্ভলগড়কে ইতিহাস ও লোককথার মিলনস্থল করে তুলেছে।

×
  • CTVN