পাহাড় ছাড়া ভারতের যেখানেই যান বেছে নেবেন শীতকাল। পঞ্চানন্দ তালুকদার তাই এবারের শীতে বেছে নিয়েছেন পাচমাড়ি। মধ্যপ্রদেশের পাচমাড়িকে বলা হয় সাতপুরার রাণী। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ১৬০৭ মিটার উঁচুতে অবস্থিত পাচমাড়ি। নামটা প্রথম শুনেছিলেন অফিসের তাপসের কাছ থেকে। তাপস বিয়ে শাদি করেনি গোটা বছরই শুধু ঘুরে বেড়ায়। তাপসের থেকে সব ডেটা নিয়ে তালুকদার বাবু একদিন টুলটুল বৌদির সঙ্গে প্ল্যানটা করে ফেললেন। কলকাতা থেকে ট্রেনে পিপারিয়া সেখানথেকে পাচমারি মাত্র ৫৪ কিলোমিটার। পিপারিয়া স্টেশনের বাইরে সাঙ্গরিলা রেস্টুরেন্ট। পেট পুরে পোহা আর জিলিপি খেয়ে নিলেন দুজনে। বাংলার জিলিপি এবং মধ্যপ্রদেশের জালেবির মধ্যে একটু বেসিক ফারাক আছে। সাঙ্গরিলার জালেবি একটু মোটা, রস বেশি আর তার ওপরে আমন্ড কুচি করে ছড়ানো।
স্টেশনের বাইরে অনেক চার চাকা দাঁড় করানো আছে বটে কিন্তু মোহনের হাসিটাই পছন্দ হল পঞ্চানন্দ বাবুর। গাড়ির চাকা ঘুরল। এসি চালানোর দরকার পড়ল না। জানলার কাঁচটা নামিয়ে বাচ্চাদের মত মুখটা বাড়িয়ে রইলেন। পাচমাড়িতে রয়েছে মনোরম প্রাকৃতিক দৃশ্য, ঝর্ণা, এরই সঙ্গে রয়েছে সবুজ বন। পাচমাড়ি নামটি হাজার হাজার বছর পুরানো। পঞ্চপাণ্ডবদের পাঁচ খানা গুহা থেকে এই পাচমাড়ির নাম। বিশ্বাস করা হয় পাণ্ডবরা তাদের স্ত্রী দ্রৌপদীর সঙ্গে নির্বাসনের সময় এখানে বসবাস করেছিলেন। সাতপুরার সর্বোচ্চ শৃঙ্গ ধূপগড় থেকে সূর্যাস্ত দেখুন। যতদূর চোখ যায় সবুজ বন। গোটা বনের ওপর মেঘের চাদর। এখানে আরএকটি আকর্ষণ হল শঙ্কর গুহা। একটু ভালোভাবে দেখলে মনে হবে জটাধারী শিব ধ্যানমগ্ন হয়ে রয়েছেন। লোককথা অনুসারে, এখানেই ভষ্মাসুর দৈত্যের হাত থেকে ভগবান শিব লুকিয়ে ছিলেন । গুহার শেষ প্রান্তে একটি শিলাস্তম্ভকে দেখতে একটি সাপের ফণার মতো, স্থানীয়ভাবে বিশ্বাস করা হয় এটিই শেষনাগ।
পাঁচমাড়ি গুহা আর শঙ্কর গুহা মিলিয়ে প্রায় তেরশ পঞ্চান্ন বার প্রণাম করেছেন তালুকদার দম্পতি। রাম তেরি গঙ্গা মইলি থেকে পঞ্চানন্দ বাবুর ঝরণা ভীষণ পছন্দের। এখানে রয়েছে বি ফলস, অপ্সরা বিহার জলপ্রপাত, সিলভার ফলস। সূর্যর আলো যখন সিলভার ফলসের ওপর পরে তখন যেন মনে হয় রুপোর বিনুনী বেঁধেছে কিশোরী সাতপুরা। পাচমাড়ি থেকে দশ মিনিট দূরে অপ্সরা বিহার জলপ্রপাত। কেন এমন নাম? ব্রিটিশ মহিলারা এ ঝরনায় স্নান করতেন। সাদা দুধের নাহালের মত মাছি পিসলিয়ে যাওয়া তাদের শরীর, ঠিক যেন অপ্সরা। সেখান থেকে এই নাম। রয়েছে মৌমাছি জলপ্রপাতও পাচমাড়ি বাসস্ট্যান্ড থেকে ৫ কিমি দূরে অবস্থিত এই জলপ্রপাত। দূর থেকে এর শব্দ অনেকটা অলির গুণগুণের মত।
প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের পাশাপাশি, আপনি সাতপুরা টাইগার রিজার্ভে জিপ সাফারির মতো অ্যাডভেঞ্চার অ্যাক্টিভিটি উপভোগ করতে পারেন । সবুজ বনে সূর্যের আলো না পৌঁছালে সেখানে কালছে ছোপ পড়ে। চোখের ভূলে মাঝে মাঝেই জাগুয়ার দেখে ফেলছিলেন টুলটুল বৌদি। আপনার ভ্রমণে আরও রোমাঞ্চ যোগ করতে আপনি পাচমাড়ির কেন্দ্রস্থলে প্যারামোটরিং, এটিভি বাইক রাইড, প্যারাগ্লাইডিং, রক ক্লাইম্বিং এবং আরও অনেক কিছু । তবে এসবের দিকে পা বাড়ালেন না দুজনে।
পুরানো স্থাপত্য বরাবর টানে টুলটুল বৌদিকে। ক্রাইস্ট চার্চের থেকে যেন চোখই সরছিল না। মধ্যপ্রদেশে মানে ভারতের হৃদয়। আপনি MPSTDC এর যেকোনও প্রপার্টিতে আপনার থাকার ব্যবস্থা করতে পারেন নিজের বাজেট অনুসারে। এছাড়াও হাজার হোটেল আছে। ফেরার সময় মধ্যপ্রদেশের পেঁড়া আনতে ভুলবেন না। বাদাম, আখরোট, জাফরান মেশানো পেঁড়া একবার খেলে মুখে লেগে থাকবে।