কচির দোকানের মোগলাইয়ের থেকে তরকারির টিআরপি বেশী। রবিবার সন্ধ্যায় একটি মোগলাই দুটো প্লেটে নিয়ে আড্ডা দিচ্ছিলেন পঞ্চানন্দ তালুকদার আর দীপু। দীপু ইউনিভার্সিটির চত্ত্বর পেরিয়ে এখন মাইথলজি নিয়ে পিএইচ ডি করছে। মাইথলজির সঙ্গে বিজ্ঞান মিশিয়ে একটা পাঁচফোরণ টাইপের বিষয়। ওদিকে একটি টাকা ম্যাচিওর করেছে পঞ্চানন্দ তালুকদারের। সুতরাং মনটা বেড়ু বেড়ু করেই চলেছে। ওদিকে দীপু মোগলাইয়ের ছোট একটা টুকরো আলু আর সসে মাখিয়ে মুখে পুরে বলল আচ্ছা তালুকদার দা রামায়ন সত্যি ছিল নাকি সব গল্প কথা? কী করে বলি বলোতো? তোমরা লেখা পড়া করছ, তোমরাই বলতে পারবে। আমার মনে হয় রামায়নের গল্পে কিছুটা রঙ হয়তো চড়েছে। কিন্তু ঘটনাটা ঘটেছিল একদিন। কথাটা বলে পঞ্চানন্দ তালুকদারের দিকে তাকালো দীপু। তারমানে তুমি বলছ অতবড় সমুদ্রে পাথরের সেতু, রাবণের উড়ো জাহাজ, শক্তিশেল, ব্রহ্মাস্ত্র, সঞ্জীবনী ঔষধ সব সত্যি! আপনাকে বরং ধরে ধরে ব্যখ্যা দেওয়া যাক। দীপু এবার বোঝানোর মোডে।
ধরুন আপনার একটা নিজের বিমান আছে তাহলে। অবশ্যই একটা বিমানবন্দর থাকবে। রাবণেরও ছিল। একটা নয় একাধিক বিমান বন্দর। শ্রীলঙ্কায় কমপক্ষে ছটি এমন জায়গা আছে যার সঙ্গে বিমান বন্দরের একাধিক মিল আছে। শ্রীলঙ্কায় ওয়েরাগানটোটা নামে একটি গ্রাম আছে যেখানকার মানুষ মনে করেন সেখানেই রাবণ সীতাকে নিয়ে নেমেছিলেন। ওয়েরাগানটোটার অর্থ বিমান অবতরণের স্থান। রাবণের শুধু বিমান বন্দর নয় বিমান রক্ষণাবেক্ষনের জায়গাও ছিল। গুরুলুপোথাকে উড়ন্ত রথ মেরামত কেন্দ্র হিসেবে বিবেচনা করা হত । রাবণ সবথেকে বেশি যে বিমানবন্দরটি ব্যবহার করত সে জায়গাটার নাম উসানাগোডা। যদিও বিশ্বাস করা হয় এই বিমানবন্দর হনুমান পুড়িয়ে দিয়েছিল। এখনও বিশাল জমিতে ঘাস ছাড়া এখানে কোনও গাছপালা জন্মায় না। মাটি কালো রঙের । যেন পুড়ে গেছে।
আর একটা তথ্য জানলে আপনি চমকে যাবেন। পঞ্চানন্দ তালুকদারের মুখে মোগলাই। বোঝাই যাচ্ছে আগ্রহের সঙ্গে শুনছেন নিজের হাঁটুর বয়সী ছেলেটার কথা। শ্রীলঙ্কায় রয়েছে সঞ্জীবনী পর্বতমালা। লক্ষণকে বাঁচানোর জন্য কিছু ভেষজের প্রয়োজন ছিল। যে ভেষজ জন্মায় কেবলমাত্র হিমালয়ে। হনুমান সঞ্জীবনী বুটি চিনতে না পেরে গোটা পাহাড়টি উপড়ে লঙ্কায় নিয়ে যান। তা তো জানি বললেন পঞ্চানন্দ তালুকদার। সেই পাহাড়ের কিছু অংশ পড়েছিল শ্রীলঙ্কায়। রিতিগালা এমন একটি পাহাড় যেখানে শ্রীলঙ্কার তীব্র বিপরীত গ্রীষ্মমন্ডলীয় উদ্ভিদের মধ্যে এখনও বিদেশী হিমালয় উদ্ভিদ এবং প্রচুর ঔষধি গাছের সন্ধান পাওয়া যায়। বলুন এর থেকে বড় প্রমাণ আর হতে পারে? পঞ্চানন্দ তালুকদার কোনও ভাবে মোগলাইয়ের টুকরোটা গিললেন।
বলুনতো রাবণ সীতাকে কোথায় রেখেছিল? কোথায় আবার অশোকবনে। সেই অশোকবন আজও আছে নুরয়ারা এলিয়ার কাছে হাকগালা বোটানিক্যাল গার্ডেনের পাশে অবস্থিত। অশোক গাছের ফুলকে বলা হয় সীতা ফুল। এ ফুলটিকে দেখতে অনেকটা ধনুর্ধরধারী এক ব্যক্তির মত। আজও এখানেই অশোক গাছ দেখতে পাওয়া যায়। গোটা শ্রীলঙ্কায় আর কোথাও অশোক গাছ নেই। এমনকি হনুমানের পদচিহ্নও দেখতে পাওয়া যায় সেখানে। হনুমান তার লেজের আগুনে অশোকবনের অর্ধেক জ্বালিয়ে দেন। আজও অশোক বনের কিছুটা মাটি ছাইয়ের মত কালো।
রাবন সীতাকে এক জায়গায় রাখেননি। পথে রাবণ সীতাকে চালের গোলা জলখাবার হিসেবে দিয়েছিল। সীতা সেগুলি না খেয়ে পথে ছড়িয়ে দিয়েছিলেন। আজও রাবনের রথের পথে এগুলি পাওয়া যায়। স্থানীয়রা এগুলিকে সীতা গোলি বলে। পাহাড়ের চূড়ায় রাবনের রথের পথ আজও দেখতে পাওয়া যায়। সীতার চোখের জল দিয়ে সৃষ্টি হয়েছিল একটি পুকুর। পুকুরটি তীব্র গ্রীষ্মেও শুকায় না।
রাবনের রাজ্য যদি এত সুন্দর হয় তাহলে প্রাসাদটিও সুন্দর হতে হবে। অনেকেই সিগিরিয়া লায়ন রককে রাবনের প্রাসাদ বলে মনে করেন। একটি বিশাল পাথরের উপরে একটি প্রাচীন প্রাসাদ এবং দুর্গ অবস্থিত। চূড়ায় পৌঁছাতে হলে ১২০০-এরও বেশি সিঁড়ি বেয়ে উঠতে হয়। সিঁড়িগুলি তৈরি করা হয়েছে আধুনিক কালে। তাহলে, কীভাবে তারা একটি বিশাল পাথরের উপরে একটি বিশাল প্রাসাদ তৈরি করেছিল, যেখানে যাওয়ার কোনও সঠিক পথ ছিল না, এই প্রশ্নটি আরও হাজার প্রশ্নের জন্ম দেয়। প্রমাণ দেয় উড়ন্ত যন্ত্রের।
এবার আসা যাক রাম সেতু প্রসঙ্গে। নল ও নীল বানর সেনার দুই ইঞ্জিনিয়ার বানিয়েছলেন এই সেতু। এতো আমাদের সকলেরই জানা। তবে আশ্বর্যের কথা হল বর্তমানে বিজ্ঞানীরা বলছেন রামসেতুতে ৭ হাজার বছরের পুরানো ভাসমান পাথর পাওয়া গেছে। মান্নার দ্বীপের উত্তর-পশ্চিম উপকূলে অবস্থিত তালাই মান্না ভারত ও শ্রীলঙ্কার মধ্যে সব থেকে কম দূরত্বের স্থান। এখানথেকে দুই দেশের মধ্যে প্রাচীন স্থল যোগাযোগের অবশিষ্টাংশ দেখা যায়।
সবই তো বুঝলাম ভায়া। কিন্তু সোনার লঙ্কা কোথায় গেল। কেন তার কোনও অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায়নি এখনও। বিজ্ঞের মত মাথা নাড়িয়ে দীপু বলল, একবারও তো একথা বলিনি দাদা রামায়নের সব রহস্য আবিষ্কৃত হয়ে গিয়েছে। সোনার লঙ্কা যে সত্যি সোনার হতে হবে তার কী কোনও মানে আছে। ফেলুদার কথায় তো বলাই যায় সোনার ছেলে কী সোনা দিয়ে তৈরি সোনার ফসল, সোনার বাংলা সে সব কী সোনা দিয়ে তৈরি? এবারে পঞ্চানন্দ তালুকদার আসল কথাটা পারলেন। তা ভায়া শ্রীলঙ্কায় ঘুরতে গেলে আমার আর তোমার বৌদির মিলিয়ে কত টাকা খরচ পড়বে। দীপু একটু হেসে বলল শ্রীলঙ্কায় ঘোরার খরচ তো খুব একটা বেশী হবার কথা নয়। যাওয়া আসা ফ্লাইটের খরচ ধরলে পঞ্চাশ হাজারের মধ্যে এক একজনের হয়ে যাওয়ার কথা। আর আমি যেসব জায়গার কথা বললাম সেগুলি তো রামায়নের সঙ্গে যুক্ত জায়গা।এছাড়াও শ্রীলঙ্কায় এমন জায়গা আছে যে আপনি একবার গেলে আর ফিরতে চাইবেন না।