শীতকাল চলে এসেছে সুপর্ণা। টুলটুল বৌদি বললেন মরণ। রবিবার কোথাও নিয়েও গেলে না। সারা সপ্তাহ ঘরে বসে। পঞ্চানন্দ তালুকদার বললেন সামনের রবিবার মাস্ট। কোথায় নিয়ে যাবে? ভুটিয়ারা এতদিন চলে এসেছে। তোমার আমার দুটো শোয়েটার কিনে গড়ের মাঠে চিনেবাদাম খাব। তুমি যাও তোমার ছেলেবেলার প্রেমিকার সঙ্গে। ছদ্মরাগে বললেন টুলটুল বৌদি। টুলটুল বৌদির ছদ্মরাগে গোটা সপ্তাহ তালুকদার দার দিমাগে আরশোলা ঘুরে বেড়াল। শেষ পর্যন্ত অফিসের তাপসের বুদ্ধিটাই বেস্ট মনে হল পঞ্চানন্দ তালুকদারের। রবিবার ভোর ছটায় বেড়িয়ে পরা গেল বাড়ি থেকে। স্রেফ ঝাড়া হাতপায়ে। তালুকদার দা অনেকদিন বাদে তার এনফিল্ড টা বের করলেন। বৌদিকে পিছনে বসিয়ে পঞ্চাশে গাড়ি চলতে শুরু করল। বেহালা পার করে জেমস লং সরণী হয়ে জোকা মেট্রো। ডায়মন্ড হারবার রোড দিয়ে ডিগ ডিগ করে চলছে এনফিল্ড ক্লাসিক। দুজনের মনেই গান বাজছে তুমিই বলো। ২০-২২ কিলোমিটার পার করে পৈলানের স্বামী নারায়ণ মন্দির।
২০১৪ সালে এই মন্দিরটি জনগনের জন্য খুলে দেওয়া হয়। কথিত আছে ভগবান স্বামীনারায়ণ নীলকান্ত রূপে কপিলমুনির আশ্রম দর্শনের জন্য এ স্থান দিয়ে গিয়েছিলেন। ২০০ একর জায়গা জুড়ে ক্ষেত্রে ক্ষেত্রে বিস্তৃত এই মন্দির। রাজস্থানের গোলাপী বেলেপাথর আর লাল পাথর দিয়ে তৈরি এই মন্দিরটির স্থাপত্যকীর্তি এক কথায় অনবদ্য। শুধু স্বামীনারায়াণ নন। মন্দিরে পূজিত হন শ্রী ঘনশ্যাম মহারাজ, শ্রী হরেকৃষ্ণ মহারাজ, রাধা-কৃষ্ণ, সীতা-রাম, হনুমানজী, শিব-পার্বতী এবং গণেশজীও। সকাল সাতটা ত্রিশে খোলে মন্দিরের দরজা। খোলার আগেই পৌঁছে গিয়েছিলেন তালুকদার দা রা। মন্দির চত্ত্বরে একটি নিরামিষ ক্যান্টিন রয়েছে। খাবার মান অত্যন্ত ভালো।
সেখানেই এক প্রস্থ খেয়ে বারোটার সময় দুজনে রওনা দিলেন ডায়মন্ড হারবারের দিকে। এখান থেকে ফতেপুর সরিষা পার করে ডায়মন্ড হারবার মাত্র ত্রিশ কিলোমিটারের মত। এখানে গঙ্গা সাগরের সঙ্গে মিলিত হবার জন্য একটি দক্ষিণমূখী বাঁক নিয়েছে। গঙ্গার অন্তিম গতিতে এপার ওপার প্রায় দেখায় যায় না। শীতের রোদ ঝিকিমিকি করছে গঙ্গায়। গঙ্গার পারে বেশ কয়েকটা অস্থায়ী হোটেল। বসে চা ডিম টোস্ট খেতে খেতে গঙ্গার রূপ দেখতে লাগলেন দুই মাঝবয়সী রোমিও জুলিয়েট। সামনেই রয়েছে একটি পর্তুগীজ দুর্গের ধ্বংসাবশেষ। ১৬০০ শতকে এই এলাকায় পর্তুগিজ জলদস্যুরা চিংড়িখালি নামে এই কেল্লাটি তৈরি করেছিল। ব্রিটিশরা পরে ডায়মন্ডহারবার নামকরণ করেন। এবং এটিকে নৌ বাণিজ্যিক ঘাটি হিসেবে গড়ে তোলেন।
পাশেই রয়েছে একটি প্রাচীন লাইট হাউজ। সমুদ্রে যখন কোনও লাইট হাউসের আলো দেখা যায় তখন সেই লাইট হাউস সম্পর্কে জানতে পারেন নাবিকরা। কিন্তু কীভাবে। প্রতিটি লাইট হাউসের আলোর একটি নির্দিষ্ট বৈশিষ্ট আছে। ডায়মন্ড হারবারের লাইট হাউজের আলোর বৈশিষ্ট হল দশ সেকেন্ড ছাড়া ছাড়া এখানে লাল এবং সাদা দুটি তীব্র আলো দেখা যেত। সাদা আলোটি ১৭ নটিক্যাল মাইল এবং লাল আলোটি ১৪ নটিক্যাল মাইল পর্যন্ত দেখা যেত। বর্তমানে যদিও নদীর ভাঙনে এই লাইট হাউজটি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। সব দেখে শুনে যখন দুজনে ঘরে ফেরার প্রস্তুতি নিচ্ছে তখন গঙ্গায় সূর্য আবির গুলেছে।
একরাশ ভালোলাগা নিয়ে এবার ফেরার পালা। ফিরতে ফিরতে আদুরে গলায় টুলটুল বৌদি বললেন, রাতের খাবারটা কিনে নিয়ে ঢুকবে? ফিরে আর রান্না করতে ইচ্ছে করবে না। পঞ্চানন্দ তালুকদার উদার গলায় বললেন বিরিয়ানি খাবে নাকি চাইনিজ?