আপনি দাঁড়িয়ে আছেন সামনে ধর্ম, অর্থ, কাম, মোক্ষের এক অদ্ভুত মিশেল। গোটা মন্দির চত্ত্বর তৈরি হয়েছিল চান্দেলা রাজবংশের আমলে সালটা মোটামুটি ভাবে ৯৫০ থেকে ১০৫০ খ্রিষ্টাব্দ। ছয় বর্গ কিলোমিটার জায়গা জুড়ে আগে ৮৫ টি মন্দিরের অস্তিত্ব থাকলেও বর্তমানে তা এসে দাঁড়িয়েছে ২২ টিতে। মধ্য়প্রদেশের ছত্রপুর জেলা। গরমে উষ্ণতা থাকে ৪৪ ডিগ্রির আশে পাশে। বর্ষাকাল টাও মন্দিরের খুঁটিনাটি দেখার জন্য মনোরম নয়। তাই বেছে নিন অক্টোবর থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সময়টাকে। আপনি বাংলা বিহার উড়িষ্যা উত্তরপ্রদেশ-রাজস্থান দক্ষিণ যেখানেই থাকুন না কেন ট্রেন পথে খাজুরাহো যেতেই পারেন। অথবা দিল্লি, মুম্বই থেকে বা ভারতে বেশ কিছু জায়গা থেকে খাজুরাহের প্লেন ধরতে পারেন।
খাজুরাহের সামনেই বেশকিছু থাকার জায়গা রয়েছে বাজেট অনুসারে একটি একটি হোটেল নিয়ে পরের দিনের জন্য তৈরি থাকুন। যদি খাজুরাহোকে ভালো ভাবে জানতে চান, তাহলে হাতে অন্তত ৩ দিন রাখতে হবে। খাজুরাহো নামটির উৎস জানতে হলে একটু তলিয়ে ভাবার প্রয়োজন আছে। এর প্রাচীন নাম খর্জুরবাহক। প্রাচীন কালে এই গোটা মন্দির চত্ত্বরটি আটটি গেট দ্বারা ঘেরা ছিল আর এই গেটের বাইরে সার বেধে খেজুর গাছ লাগানো ছিল। একটা মত বলে খর্জুরবাহক নামটি এসেছে খেজুর গাছ থেকে। আর একটা মতে খাজুরা বাহক মানে বিচ্ছু বহনকারী বিচ্ছু আসলে বিষাক্ত কামনার প্রতীক। খাজুরাহের বেশ কিছু ভাষ্করর্যে বিচ্ছুবাহক চিত্রিত রয়েছে বাম উরুতে বিচ্ছু, পেটে বিচ্ছু, তা সে যাই হোক না কেন আপনি দেখবেন শিল্পের অপার সৌন্দর্য্য। চান্দেলা রাজবংশ ছিল মধ্য ভারতের একটি রাজপুত গোষ্ঠী। এরা নবম থেকে ত্রয়োদশ শতাব্দী পর্যন্ত বুন্দেলখন্ড অঞ্চল শাসন করেছিল। এই বংশের প্রতিষ্ঠা তিলেন নান্নুক, রাজা বিদগ্ধধরের আমলে এরা শৌর্যের শিখরে পৌঁছয়। এ সময় এই রাজবংশ মামুদকে প্রতিহত করেছিল। এই রাজবংশের আমলেই খাজুরাহো মন্দিরের সৃষ্টি।
একাদশ শতাব্দীতেকে গজনভি এবং ঘুরিদের মত বহির্শক্তির আক্রমণে চান্দেলা রাজবংশ ধীরে ধীরে তাদের গৌরব হারায়। চান্দেলা কারুকারি হিন্দু ও জৈন ধর্মের বিভিন্ন দিক তুলে ধরে। মন্দিরগুলি ভারতীয় স্থাপত্যের নাগর-শৈলীতে নির্মিত। একদিন হোটেলে থেকে ডিএলএলআর নিয়ে বেড়িয়ে পড়ুন বিশ্ময়ের রাজত্বে। খাজুরাহোর বৃহত্তম মন্দির কান্দারীয় মহাদেব মন্দির। রাজা গন্ডদেবের রাজত্বালে মন্দিরটি শিবকে উৎসর্গ করা হয়েছিল। খাজুরাহো কমপ্লেক্সের পশ্চিমে অবস্থিত লক্ষ্মণ মন্দির। দশম শতাব্দীর এই অসাধারণ মন্দিরটি খাজুরাহোর সবচেয়ে প্রতীকী এবং প্রাচীনতম নিদর্শনগুলির মধ্যে একটি। হিন্দু দেবতা, প্রাণী এবং অন্যান্য চিত্তাকর্ষক নকশার জটিল খোদাই দ্বারা সজ্জিত এই মন্দির। বিশেষ করে উল্লেখযোগ্য হল ভগবান বৈকুণ্ঠ বিষ্ণুর চিত্রিত শৈল্পিকভাবে তৈরি ভাস্কর্যগুলি। দক্ষিণ দিকে অবস্থিত দুলহাদেব মন্দির। এটিও শিবের উদ্দেশেই নির্মিত হয়েছিল। মন্দিরটিতে পাঁচটি ছোট কক্ষ এবং একটি বদ্ধ হলঘর রয়েছে। মন্দিরের মূর্তিগুলির সুক্ষ্ম কারুকারি আপনাকে মুগ্ধ করে। মন্দিরের দেওয়াল এবং ছাদের ভাস্কর্যও আপনাকে মুগ্ধ করবে। পূর্ব দিকে অবস্থিত চিত্রগুপ্ত মন্দিরটি সূর্য দেবতার একমাত্র শ্রদ্ধাঞ্জলি হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে। মন্দিরের কেন্দ্রে রয়েছে পাঁচ ফুট লম্বা সূর্যদেবের একটি মূর্তি। দক্ষিণ দেয়ালে রয়েছে ১১ মাথাওয়ালা ভগবান বিষ্ণুর একটি মূর্তি। মন্দিরের অভ্যন্তরভাগ নৃত্যশিল্পী, হাতির যুদ্ধ, শোভাযাত্রা এবং শিকারের দৃশ্যে খোদিত রয়েছে। মন্দিরের বাইরের অংশটিও সমানভাবে মনোমুগ্ধকর, অপ্সরা , মিথুন মূর্তি দ্বারা সজ্জিত। রয়েছে জাভেরি মন্দির। ভগবান বিষ্ণুর মুণ্ডহীন মূর্তি বর্তমানে দেশজুড়ে আলোচনার বিষয়বস্তু হয়ে উঠেছে। বহু বিদেশী পর্যটকের বিবরণীতে খাজুরাহের বর্ণনা পাওয়া যায়।
এমনকি ইবন বতুতার ভারত ভ্রমণ স্মৃতিকথায় খাজুরাহের বর্ণনা রয়েছে। শুধু মন্দির নয় এখানে এলে দেখতে হবে বিন্ধ্য পর্বতমালায় অজয়গড় দুর্গ। সমতল থেকে ২০৬ মিটার উচ্চতায় অবস্থিত এই দুর্গের গঠনশৈলী প্রশংসার যোগ্য। মধ্যপ্রদেশের ছত্তিশগড় জেলায় অবস্থিত, পান্না জাতীয় উদ্যান খাজুরাহো ভ্রমণকারীদের কাছে একটি জনপ্রিয় গন্তব্যস্থল। যদিও এই সংরক্ষিত অঞ্চলে বাঘ দেখা ভাগ্যের বিষয়, তবুও আপনি শিয়াল, হরিণ, হরিণ এবং অন্যান্য অসংখ্য বন্য প্রজাতির সাথে দেখা করতে পারেন যা আপনাকে মোহিত করবে। রাজকীয় কেন নদী, মনোরম বিন্ধ্য পর্বতমালা, শুষ্ক পর্ণমোচী বন এবং সাভানা-সদৃশ তৃণভূমি পার্কটির আকর্ষণকে আরও বাড়িয়ে তোলে। দেখে নেবেন বহু রঙের পাথর দিয়ে সাজানো রানেহ জলপ্রপাত। একদিন ঘুরে আসুন বেণীসাগর বাঁধ থেকে। নৌকা বাইচ করে অস্তগামী সূর্যের সাক্ষী থাকুন। ত্রয়োদশ থেকে অষ্টাশ শতাব্দীর মধ্যবর্তী সময় পর্যন্ত বিভিন্ন মুসলিম রাজবংশের শাসনকালে এই মন্দির লোকচক্ষুর আঁড়ালে চলে গেলেও ১৮৩০ সালের কাছে-পিঠে ব্রিটিশ সার্ভেয়ার টি এস বার্ট জায়গাটি বিশ্বের কাছে তুলে ধরেন। খাজুরাহো এক অপার বিস্ময়। আপনার ক্যামেরার জিবি শেষ হয়ে যাবে। কিন্তু মন ভরবে না। বাজেট ফ্রেন্ডলি একটি ট্যুর করতে চাইলে দশহাজার টাকার মধ্যে আপনার গোটা ট্যুর হয়ে যেতে পারে। তাহলে আর দেরী কেন? এবার শীতে আপনার যাত্রা হোক খাজুরাহো।