দুর্গাপুজো। বাঙালির প্রাচীন পুজো। তবে শুরুর সময়টা আরও প্রাচীন। বহুকাল ধরে যার ঐতিহ্য বহন করে আসছে বঙ্গজীবন। সময়টা সত্যযুগ। সুশাসক হিসাবে পরিচয় ছিল রাজা সুরথের। তবে কোনো এক যুদ্ধে পরাজিত হয়ে অরণ্যযাত্রা করেছিলেন অভিমানী রাজা। রাজ্য জুড়ে দুরাবস্থা। অমাত্যরা প্রমাদ গুনলেন। এই সুযোগ! ধনসম্পদ ও রাজ্য অধিকার করে লুটেপুটে খেতে শুরু করলেন সবটুকু। অন্যদিকে বনে বনে ভ্রমণ করতে লাগলেন রাজা সুরথ। পৌঁছলেন তপোবনে। মেধা ঋষির আশ্রমে পৌঁছে প্রয়াস করলেন সাংসারিক চিন্তা ত্যাগের। তবু কিছুতেই স্থির থাকে না মন। হৃতরাজ্যের ভালোমন্দের চিন্তায় ঘুম আসে না শঙ্কিত রাজার।
ওই একইসময় একজন বৈশ্যর সাথে আলাপ রাজার। তিনিও একইরকম বিভ্রান্ত। তাঁর স্ত্রী-পুত্র প্রতারণা করেছেন তাঁর সাথে। সর্বস্ব কেড়ে নিয়েছে। নিজ গৃহ থেকে আপনজনকতৃক বিতাড়িত। তবুও তিনি দিন গুনছেন উৎকণ্ঠায়। পরিবারের জন্য শুভকামনা করে চলেছেন। যাঁরা তাঁর সর্বস্ব লুঠ করেছেন, তাঁদের প্রতিই তিনি মুগ্ধ। ক্রমাগত অনুকম্পা জাগছে মনে। দুজনেই নিজেদের সপে দেন মেধা ঋষির কাছে। কাতরস্বরে উত্তর জানতে চান কী করবেন? ঋষি তাঁদের আধ্যাত্ম পথের সন্ধান দেন। দেবী চণ্ডীর মাহাত্ম্য বিষয়ে অবগত করেন দুই বিভ্রান্ত মানুষকে। ঋষির কাহিনী শুনে অনুপ্রাণিত রাজা ও বৈশ্য নদীতীরে কঠোর তপস্যায় মগ্ন হন। এই তপস্যা শেষে তাঁরা দেবীর আরাধনা করেন। দুর্গাপূজা। তবে এটি ছিল বসন্তকাল, শরৎকাল আসতে ঢের দেরি। দেবীর বরে রাজা সুরথ হারানো রাজ্য পুনরুদ্ধার করেন ও বৈশ্য তত্ত্বজ্ঞান লাভ করেন। পুরাণ মতে এমন কাহিনীই উল্লিখিত।
যদিও ইতিহাসবিদরা ভিন্ন তত্ত্ব পোষণ করেন। শোনা যায় অধুনা বাংলাদেশের রাজশাহীর রাজা কংসনারায়ণ প্রথম শারদীয়া দুর্গাপুজো আয়োজন করেন। সালটা আনুমানিক ১৫৮০ থেকে ষোড়শ শতাব্দীর সূচনা অবধি। তারপর এই শতাব্দীরই অন্তিমভাগে দিনাজপুর ও মালদহের জমিদাররা বঙ্গে দুর্গাপুজোর সূচনা করেন। নদিয়ার ভবানন্দ মজুমদারও আবার সাবেক পুজোর জনক বলে অনেকে মনে করেন। তবে বারোয়ারি বা সর্বজনীন বলে আজ যে পুজো প্রচলিত, তার শুরুটা কিন্তু হয়েছিল আজকের হুগলিতে। গুপ্তিপাড়ার বারোজন বন্ধুরা মিলে ঠিক করে দুর্গাপূজা করবে। অগত্যা যেমন ভাবা তেমন কাজ। স্থানীয় বাসিন্দাদের থেকে চাঁদা সংগ্রহ করে ১৭৯০ সাল নাগাদ প্রথম সর্বজনীন দুর্গোৎসব আয়োজিত হয় বাংলার বুকে। ১৮৩২ সালে কাসিমবাজারের রাজা হরিনাথ এই বারোয়ারি পুজো নিয়ে কলকাতায় চলে আসেন। এভাবেই ঐতিহ্য ও বনেদিয়ানা হাত ধরাধরি করে পথ হেঁটেছে বাংলার বুকে। পুজো ও ইতিহাস, উভয়েরই সমান্তরাল গতিপথ।