প্রেম বাঙালির অতি প্রিয় বিষয়। কিন্তু এই 'বিষয়'ই যখন প্রত্যয় ছেড়ে 'বিষ'রূপে প্রকট হয়, তাই হয়ে ওঠে গলার কাঁটা। তবু মাখামাখা চচ্চড়ি বাঙালির খুব প্রিয়। আরও প্রিয় দুর্গাপুজো। তাই প্রিয় উৎসব প্রেম বর্জিত হয় কি করে? পুজো প্রেম, তাতে মিশে হাজারও নস্টালজিয়া। শুধু পুজো উপলক্ষে কত প্রেমের গান, রঙিন অ্যালবাম পেয়েছে বাঙালি। মজেছে প্রেমরসে। নব্বইয়ের দশক। বাংলা গানে আসছে নতুন জোয়ার। প্রেম নিবেদনেও স্থান পাচ্ছে 'তোমাকে চাই’। আর চিঠির পাতায়, বাংলা কোচিংয়ের খাতায়, ভাঁজে ঢুকে যাচ্ছে প্রেমের বার্তা। কিন্তু তখনকার প্রেম আর জেনজির প্রেম খানিক ভিন্ন নয় কি? নাকি পুরোটাই পৃথক সত্ত্বা।
এই কিছুদিন আগে সমাজমাধ্যমে ভাইরাল হল, পুজোয় পার্টনার চাই বিজ্ঞাপন। ভাসে আরও কিছু শব্দবন্ধ। যেমন, সিচুয়েশনশিপ, লাভ বম্বিং, ব্রেড ক্রাম্বিং প্রভৃতি।
এগুলো কী সবই খারাপ? জেনজির প্রেমও কী বদলাচ্ছে? অনুসন্ধান করা যাক।
ধরুন কোনো একটি ছেলে বা মেয়ে মাঝেমাঝে আপনাকে মেসেজ করে। তার মেসেজ পেতে আপনার ভালোও লাগে। কিন্তু একদমই নিয়মিত নয়। কখনও আপনার স্টোরিতে হঠাৎ ভেসে উঠলো পপ আপ। কখনো বা একটা টেক্সট… ‘মিস ইউ’ সাথে লাভ রিএক্ট। আপনি তড়িৎঘড়িত রিপ্লাই করলেন। কিন্তু দেখলেন সীন হলো না। আপনি আবার দুয়েক ঘন্টা বাদে চেক করলেন। এখনও দুটো রাইট। এরমভাবে দিন পেরিয়ে সপ্তাহ কাটলো। হয়ত আবার পরে ভেসে উঠলো কোনো মেসেজ। আপনি নিজে থেকে কখনও দেখা করতে চাইলে হয়ত দেখলেন, প্রথমে ‘হ্যাঁ’ বলে আশা জাগিয়েও ক্যানসেল করে দিলো। আপনি একদিন রিলেসনশিপ নিয়ে সরাসরি আলোচনায় গেলেন, দেখলেন দিব্যি চেঞ্জ করে দিল টপিক। এটাকে আজকের ভাষায় বলা হয় ব্রেড ক্রাম্বিং। এহেন পরিস্থিতিতে সেই ছেলেটি বা মেয়েটি চায়, আপনি তাঁর অ্যাটেনশনে থাকুন কিন্তু কোনো কমিটমেন্ট না থাকুক।
আরেক ধরণের সম্পর্ক ইতিমধ্যে ভাইরাল। যেখানে শুরু থেকেই অতিরিক্ত ভালোবাসা, মনোযোগ, প্রশংসা, প্রতিশ্রুতির বন্যা ফোটে। খুব দ্রুততার সাথেই হতে থাকে সবকিছু। সারাদিন ফোন কিংবা টেক্সট। দ্রুত ভবিষ্যত পরিকল্পনা। দামী উপহার। কিন্তু দিনশেষে সম্পর্কের মাধুর্য ক্রমে কমতে থাকে। আরেক ধরণের বিষয় হচ্ছে, রিলেসনশীপের মত কিন্তু রিলেসনশিপ নয়। দুজনের মধ্যেই প্রেম বা আকর্ষণ বিদ্যমান। শারীরিক সম্পর্কও চলতে পারে। কিন্তু তারা নিজেরাই জানে না, ভবিষ্যত কী? তাদের সম্পর্কটা আসলে কি, সে বিষয়েই কোনো সঠিক উত্তর তাদের কাছে স্পষ্ট নয়। অগত্যা প্রেম প্রেম ভাব। এসবই পুজোর মার্কেটে হিট। আর অতীত? প্রথমবার শাড়িতে দেখার অনুভূতি। প্রথমবার সপ্তমীর সন্ধ্যায় আঙুলে আঙ্গুল রাখা। খোলা চুলের গন্ধ আর লজ্জামাখা হাসি। গানে গানে চোখ খুঁজে বেড়ায় প্ৰিয় মানুষটাকে। তাই পুজো শুধু পুজো হয়ে থাকে না আর। বেঁচে থাকে আরও অনেকটা নিঃশ্বাস নেওয়ার আনন্দ। ভালোবাসার কোমলতা। খানিক অক্টোবরের শুরুতে নাকে লেগে থাকা ছাতিম ফুলের ঘ্রাণের মতোই। আজ নগরায়নের চাপে বহু গাছ কাটা পড়েছে। শিউলি ফোটা ভোর কিংবা ছাতিমের গন্ধ বড়ো একটা আসে না ওম হয়ে আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে ধরতে। ভালোবাসার সংজ্ঞাটাও তাই খানিক অচেনা আজকে।