Calcutta Television Network

গণেশের কলা-বৌ আসলে কে?

গণেশের কলা-বৌ আসলে কে?
14 October 2026 • 02:25:43 pm

পুরাণ অনুসারে গণেশের দুই স্ত্রীয়ের নাম রিদ্ধি ও সিদ্ধি। তাহলে কলা বৌ স্নান? ভোরবেলায় ঘুমভাঙা চোখে কত যে তোড়জোড়। রাতের তারা ভরা আকাশ থাকতে থাকতেই স্নান সেরে নেওয়া। তারপর শুদ্ধ জামাকাপড় পড়ে পাড়ি দেওয়া গঙ্গা উদ্দেশ্যে।

কী এর ঐতিহ্য? শাস্ত্র বলে, দেবী দুর্গার আরাধনা আদতে নবপত্রিকার আরাধনা। ‘শাকম্ভরী’ মূর্তিকল্পনার প্রচ্ছন্ন আবরণে এই উৎসব বছরের পর বছর পালিত হয় বঙ্গভূমে। বাংলা বরাবরই কৃষিপ্রধান। আবার যেহেতু নদীমাতৃক, তাই প্রায়শই লেগে থাকতো বন্যা। কখনো আবার চড়া গ্রীষ্মে প্রবল খড়ার কবলে বিপর্যস্ত বঙ্গজীবন। তাই শস্যশ্যামলা বাংলাকে ধরে রাখতে দরকার ছিল এক বিশেষ পুজোর। সেই পৃথিবীমাতার আরাধনাই আজ নবপত্রিকা পুজো হিসাবে স্থায়িত্ব লাভ করেছে। 

পুরাণকথায় পাওয়া যায়, দেবীর ৯টি রূপ স্থির করা হয়, প্রত্যেকটির প্রতীক হিসাবে ৯টি গাছের ডাল ব্যবহার হয়। 

কলাগাছ, কালোকচু, মানকচু, হলুদ, জয়ন্তী, বেল, ডালিম, অশোক ও ধান, এই নয়টি বৃক্ষকে শ্বেত অপরাজিতার লতা ও হলুদ সুতো দিয়ে একত্রে বেঁধে তৈরি করা হয় ‘নবপত্রিকা’। দুর্গাপুজোর সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এই প্রথায় প্রতিটি উদ্ভিদই একেকটি দেবীশক্তির প্রতীক। কলাগাছ ব্রাহ্মণী, কালোকচু কালিকা, মানকচু চামুণ্ডা, হলুদ দুর্গা, জয়ন্তী কার্তিকী, বেল শিব বা শিবানী, ডালিম রক্তদন্তিকা, অশোক শোকরহিতা এবং ধান দেবী লক্ষ্মীর প্রতিরূপ হিসেবে বিবেচিত হয়।

মহাসপ্তমীর সকালে নবপত্রিকার স্নান দুর্গাপুজোর একটি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ আচার। বারোয়ারি ও সর্বজনীন পুজোর পাশাপাশি এখন এই রীতি পারিবারিক পুজোতেও পালিত হয়। কোথাও গঙ্গা বা নিকটবর্তী নদী কিংবা পুকুরে নবপত্রিকাকে স্নান করানো হয়, আবার কিছু বনেদি বাড়ির দুর্গাদালানেই সম্পন্ন হয় এই মহাস্নান। বিশেষত পারিবারিক ও মন্দিরে প্রতিষ্ঠিত দুর্গাপুজোয় এই স্নানপর্বকে ঘিরে থাকে নানা উপচারও পালন হয়।

কোথাও এই নবপত্রিকা বা ‘কলাবৌ’-এর মহাস্নানে ব্যবহৃত হয় অষ্টকলস, তেল-হলুদ, পঞ্চামৃত, পঞ্চরত্নের জল, পঞ্চগব্য, পঞ্চশস্য ও পঞ্চকষায়ের মতো বিবিধ উপকরণ। এর সঙ্গে থাকে বৃষ্টির জল, ডাবের জল, শিশিরের জল, সমুদ্রের জল, উষ্ণবারি ও তীর্থের জল। পদ্মরেণুর রস, আখের রস, সবৌষধী, মহৌষধী, বরাহদন্তের মাটি, বেশ্যাদ্বারের মাটি, চতুষ্পথের মাটি, অগুরু, চন্দন এবং ফুলের তেলও এই আচারকে এক বিশেষ তাৎপর্য দেয়। পঞ্চামৃতে থাকে দুধ, দই, ঘি, চিনি ও মধু; পঞ্চগব্যে গোচোনা, গোবর, দুধ, ঘি ও দই। অন্যদিকে পঞ্চশস্যে ধান, যব, তিল, মুগ ও মাসকলাই এবং পঞ্চকষায়ে জাম, কুল, বকুল, বেড়েলা ও শিমুলছালের রস ব্যবহৃত হয়।

বাঙালি মতে এই স্নান সম্পূর্ণ হওয়ার পর নবপত্রিকাকে নতুন বস্ত্র পরিয়ে দুর্গাপ্রতিমার ডান দিকে স্থাপন করা হয়। নবপত্রিকার আর এক নাম ‘পুষ্টি’। দেবী দুর্গার ডান পাশে গণেশের অবস্থান এবং তাঁর পাশেই শাড়ি পরানো কলাগাছ স্থাপনের কারণে অনেকেই নবপত্রিকাকে গণেশের স্ত্রী বলে মনে করেন। তবে প্রচলিত ধর্মীয় ব্যাখ্যায় কলা-বৌ আদতে নবপত্রিকারূপী দেবীশক্তির প্রতীক।