Calcutta Television Network

পতিতালয়ের মাটি কেন ব্যবহৃত হয় মা-দুর্গার আরাধনায়?

পতিতালয়ের মাটি কেন ব্যবহৃত হয় মা-দুর্গার আরাধনায়?
14 October 2026 • 01:20:29 pm

ধর্ম, যা আমাদের ধারণ করে রাখে চিরকাল। যা আগলে মানুষ যাপন করেন। সমাজের সূক্ষ্ম পর্দাগুলো ধরে থাকে যে স্বচ্ছ সুতিকা। বহু রীতিনীতিই পালিত হয়, যা আমরা বুঝি না। নিয়ম আর সংস্কারের বেড়াজালে আটকে থাকি। তবু কখনো কি ভেবেছি, কি এর পিছনের আদিম রহস্য? কী এর শিকড়? চেষ্টা করিনি বড় একটা।

বেশ্যা, বেশ শব্দটির সাথে প্রত্যয় যুক্ত হয়ে এই শব্দের সৃষ্টি হয়েছে। ব্যভিচারিণী নারীকে আমরা এই আখ্যায় ভূষিত করি। আবার সন্ধান করি দুর্গাপুজোর প্রাক্কালে। শাস্ত্র বলছে, এই মৃত্তিকাতেই পুজো হয় দেবী দুর্গার। সমাজ প্রতিমুহূর্তে যাদের ছুঁড়ে দিয়েছে বঞ্চনা, অপমান ও লাঞ্ছনা। আবার রাতের আঁধারে তাঁদের শরীরেই মুখ লুকোয় অভিজাত বাবুরা। ঘনিষ্ট হয় বারাঙ্গনাদের সাথে। রমণ লীলায় মত্ত হয় নিজের যাবতীয় পুণ্য বিসর্জন দিয়ে।

আজ আলোচনা করা যাক এই রীতির কারণ নিয়ে? হিন্দুদের প্রাচীন ধর্মবিশ্বাসও ছুঁয়ে গেছে নৈতিকতার দেয়াল। বলা হয়, যেকোনো পুরুষ যখন পৌঁছে যায় কোনো দেহপসারীনির ঘরে নিজের যাবতীয় সঞ্চিত পুণ্য সে নিরঞ্জিত করে দেয়। হিন্দু শাস্ত্রের আদিম পন্ডিতরা সেই বিশ্বাস থেকেই রীতি বানিয়েছেন সমাজের পরিসরে। আদিম বিশ্বাস, মানুষের অন্তরে যে কামনা, বাসনা, লালসা বাস করে পতিতারা তা গ্রহণ করেন নিজের শরীরে। নিজেদের কায়া অশুদ্ধ করে সমাজকে পবিত্রতা দান করেন তাঁরা। বিসর্জিত পুণ্যের পাহাড় এই ভূমি। পবিত্র বেশ্যাদ্বারের মাটি তাই ব্যবহৃত হয় দেবী মূর্তি নির্মাণে। সাধককবি রামপ্রসাদ সেই কবেই লিখেছিলেন, ‘মায়ের মূর্তি গড়াতে চাই, মনের ভ্রমে মাটি দিয়ে, মা বেটি কী মাটির মেয়ে, মিছে খাটি মাটি নিয়ে’। 

নারীকে পতিতা বানাতে একমাত্র দায়ী পুরুষ সমাজ ও তাদের কামনা বাসনা, লিপ্সা। তাই যারা এই পরিস্থিতির শিকার তাঁদের অপবিত্র করে না রেখে শাস্ত্র অধিকার দেয় সন্মানের। নারী কখনোই অপবিত্র নয়! 

শাস্ত্র কিন্তু বেশ্যার সংজ্ঞাও বিবিধ দেয়। মহানির্বাণ তত্ত্ব ঘাঁটলে জানা যায়, পূর্ণাভিষিক্ত পুরুষ ও পূর্ণাভিষিক্তা স্ত্রী সাধনমার্গের চূড়ান্ত স্তরে পৌঁছলে সেই স্থানের মাটি বেশ্যাদ্বার মৃত্তিকা প্রাপ্ত হয়। 

পুরাণ কাহিনি আবার সম্পূর্ণ আরেকটি আখ্যান ব্যক্ত করছে। ঋষি বিশ্বামিত্র ইন্দ্রের সমকক্ষ ক্ষমতা অর্জনের লক্ষ্যে কঠোর তপস্যায় মগ্ন হয়েছিলেন। তাঁর তপস্যা ভঙ্গ করতে ইন্দ্র স্বর্গের অপ্সরা মেনকাকে প্রেরণ করেন। মেনকার সৌন্দর্যে আকৃষ্ট হয়ে বিশ্বামিত্রের সাধনায় ব্যাঘাত ঘটে। এই কাহিনিতে মেনকা কামনা ও প্রলোভনের প্রতীক হলেও, বৃহত্তর সামাজিক ব্যাখ্যায় তিনি নারীসত্তারই এক প্রতিনিধি। সমাজের চোখে যাঁরা কলঙ্কিত, তাঁদের প্রতিও সম্মান ও মর্যাদা প্রদর্শনের ভাবনা এই রীতির সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে।

তাই আজও প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী, দুর্গাপ্রতিমা নির্মাণে গঙ্গার মাটি, গোবর, গোমূত্র, ধানের শিষের মতো উপকরণের পাশাপাশি পতিতালয়ের মাটিও ব্যবহারের রীতি রয়েছে। সমাজের প্রান্তে ঠেলে দেওয়া নারীদেরও বৃহত্তর নারীসমাজের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার বার্তা খুঁজে পাওয়া যায়, সমাজবিজ্ঞান ও শাস্ত্রীয় ব্যাখ্যার সহাবস্থানে।