বাঁকুড়ার কেঞ্জাকুড়ায় দারকেশ্বর নদের চরে জমে উঠেছে মুড়ি মেলা। কয়েক শো বছরের প্রাচীন এই লোকমেলায় আজও ভিড় জমান লাখো মানুষ। এই মুড়ি মেলা উপলক্ষ্যে একটা মজার লোক কাহিনী চালু আছে বাঁকুড়ায়। কথিত আছে একদিন স্বর্গরথে চড়ে দেবরাজ ইন্দ্র আকাশপথে যাওয়ার সময় প্রবল সোঁ সোঁ শব্দ শুনতে পান। রহস্য উদ্ঘাটনে রথ থামিয়ে বরুণ দেবকে ইন্দ্র জিজ্ঞাসা করেন তাঁর কারসাজিতে মর্ত্যে ঝড় উঠেছে কিনা। বরুণ দেব অস্বীকার করলে ঋষি নারদকে ইন্দ্র দায়িত্ব দেন কারন অনুসন্ধানের। ঋষি নারদ বিশ্বময় ঘুরে শেষে জানতে পারেন বাঁকুড়ার মানুষ সাত সকালে মুড়িতে জল ঢেলেছে। তারই প্রবল শব্দ মর্ত্য ছাড়িয়ে স্বর্গে পৌঁছেছে। বাঁকুড়ার মানুষের সেই মুড়িকে নিয়েই আস্ত একটা মেলা বসে প্রাচীন জনপদ কেঞ্জাকুড়ায়। কয়েকশো বছর ধরেই কেঞ্জাকুড়ার দারকেশ্বর নদের চরে মাতা সঞ্জীবনীর আশ্রমে প্রতি বছর মকর সংক্রান্তির দিন শুরু হয় হরিনাম সংকীর্তন। শেষ হয় ৪ ঠা মাঘ।
প্রাচীন কালে শ্বাপদ সঙ্কুল পথ ডিঙিয়ে হরিনাম শুনতে আশ্রমে আসতেন দূর দূরান্তের গ্রামের মানুষ। হরিনাম শুনে তাঁরা আর রাতে বাড়ি ফিরতেন না। রাতভর আশ্রমে কাটিয়ে পরের দিন সকালে নিজেদের সঙ্গে থাকা মুড়ি দারকেশ্বর নদের চরে বসে নদের জলে ভিজিয়ে তা খেয়ে বাড়ির উদ্যেশ্যে রওনা দিতেন। সময়ের সাথে সাথে কেঞ্জাকুড়ার সেই রীতি পরিনত হয় মেলায়। এখনও মাঘ মাসের ৪ঠা তারিখে কেঞ্জাকুড়া থেকে হাজারে হাজারে মানুষ জড়ো হন দারকেশ্বর নদের চরে। চপ, বেগুনি, টমেটো, মুলো শসা, লঙ্কা,পেঁয়াজ, ঘুগনি, নাড়ু, হরেক রকম মিষ্টি, জিলাপি, নারকেল সহ বিভিন্ন সামগ্রী দিয়ে চলে মুড়ি মেখে খাওয়া । নদের চরে গামছা বিছিয়ে সেই পাহাড় প্রমাণ মুড়ি বিভিন্ন অনুসঙ্গে রসিয়ে পরিবারের সকলে মিলে খান একসাথে। মুড়ি খেতে খেতে চলে গল্প গুজব আড্ডা, সেলফি তোলা।
শুধু বাঁকুড়া জেলা থেকে নয়, পুরুলিয়া, মেদিনীপুর, বর্ধমান ছাড়াও ঝাড়খণ্ড থেকেও হাজার হাজার মানুষ যোগ দেন এই মুড়ি মেলায়, জানালেন মেলার উদ্যোক্তা রঞ্জিত চট্টোপাধ্যায়।
এই মেলার প্রধান পৃষ্ঠপোষক সরকার নয় স্থানীয় গ্রামবাসীরাই। তাদেরই দানে আর সহযোগিতায় শতাব্দী প্রাচীন বাঁকুড়ার এই মুড়ি মেলা আজও চলছে স্বমহিমায়। ইতিহাসের সাক্ষী হওয়ার পাশাপাশি নদীর চরে শীতের রোদে পিঠ লাগিয়ে পরিবারের সকলে মিলে রসনা তৃপ্তির এমন রাজকীয় আয়োজনে আপ্লুত আট থেকে আশি।