আজ দ্বিতীয়া, মণ্ডপে মায়ের আগমন এখনও হয়নি, অফিসগুলো ছুটি হতে হতেও সেই পঞ্চমী। কাল থেকে মোটামুটি শুরু হয়ে যাবে রাত জাগা, চলবে সেই নবমী অব্দি টানা। ফোস্কা পড়বে পায়ে, চোখের কোণে কালি জমবে, শরীর ক্লান্ত হবে কিন্তু এসব ভাবনা ছেড়ে দিয়েই বাঙালি ঠাকুর দেখা ছাড়বে না। কিন্তু এর একটা উল্টো দিকও আছে, আরেক দলের কাছে পূজা কিন্তু শুধুই এনজয়, নিপাট এনজয়। পঞ্চমীতে অফিস শেষ করে ওই যে গ্যারেজ হয়ে যাওয়া, সোজা একাদশী। ‘প্যান্ডেল হপিং’ বাহিনী আর ‘ল্যাদখোর সংঘ’ আপাতত দু দলে ভাগ হয়ে গোটা পূজা, খেলা হবে।
ষষ্ঠীর সকাল থেকে এক দলের দিন শুরু হয় নতুন জামা, সাজগোজ, প্ল্যানিং দিয়ে। এদের কাছে পূজা মানেই কিন্তু একটা মিশন, উত্তর থেকে দক্ষিণ তিন দিনে কভার করার নিখুঁত প্ল্যান কষে নেওয়ার পালা। অন্যদিকে, ল্যাদখোর সংঘের সদস্য খোঁজে বিছানা। তাদের কাছে পূজার এই পাঁচদিন ছুটি, নো আর্লি মর্নিং অ্যালার্ম, নো তাড়াহুড়ো আর দুপুরে খেয়ে উঠে একটা তিন ঘণ্টার ঘুম। বিকেলের দিকে যখন প্যান্ডেলহপিং বাহিনী সাউথ থেকে নর্থের ভিড়ে ঘেমেনেয়ে একসা হচ্ছে, চারটে সেলফির জন্য লাইনে দাঁড়িয়ে কালঘাম ছোটাচ্ছে, ঠিক তখনই ল্যাদখোর সংঘের ঘরে এসি চলছে ১৮ ডিগ্রিতে। আপাতত দুজনেই ১-১ গোলে ড্রয়ের রাস্তায়। বাইরে যখন ঢাকের আওয়াজ আর লাউডস্পিকারে চলছে 'আয় রে ছুঁটে আয়, পুজোর গন্ধ এসেছে', ল্যাদখোররা তখন কানে হেডফোন গুঁজে ওটিটি প্ল্যাটফর্মে কোনো টানটান ওয়েব সিরিজ বা নেটফ্লিক্স দেখতে ব্যস্ত।
খাওয়া-দাওয়ার ক্ষেত্রেও এদের ফারাকটা কিন্তু দেখার মতো। প্যান্ডেল হপাররা রাত ২টোর সময় কোনো মণ্ডপের পাশে কোল্ড ড্রিঙ্কস আর ঠান্ডা হয়ে যাওয়া বিরিয়ানি বা চিকেন রোল চিবোচ্ছে। আর ল্যাদখোর সংঘের সদস্যটি সুইগি বা জোম্যাটো থেকে খাবার এনে ঘরের সোফায় বসে গরম গরম বিরিয়ানি বা পিৎজা সাবাড় করে আবার কম্বলের তলায়। তাদের বক্তব্য স্পষ্ট, "ভিড় ঠেলে রেস্তোরাঁয় যাওয়ার চেয়ে এসির তলায় বসে খাওয়া অনেক বেশি শান্তির।" এবার এই চারদিন মণ্ডপে মণ্ডপে ঘোরার পর নবমী-দশমীতে যখন প্যান্ডেল হপারদের পায়ের পাতায় ফোস্কা পড়ে যায়, পিঠের ব্যথায় সোজা হয়ে দাঁড়ানো দায় হয়, তখন তারা ল্যাদখোরদের দিকে তাকিয়ে মনে মনে একটু হিংসে করে। আপাতদৃষ্টিতে ল্যাদখোর জিতে যায় ২-১ গোলে।
আসলে, পুজো উপভোগ করার কোনো নির্দিষ্ট নিয়ম তো নেই। কেউ ভিড়ের মাঝে ঠাকুর দেখে আনন্দ পায়, কেউ আবার চারটে দিন সব কোলাহল থেকে দূরে নিজের মতো করে ‘মি-টাইম’ কাটিয়ে রিচার্জড হয়। মা দুর্গা যেমন সবার, উৎসবটাও ঠিক তেমনই, তা সে নতুন জুতো পায়ে প্যান্ডেলে হোক, আর নাইটি বা ট্রাউজার্স পরে ড্রইং রুমের সোফায়!