মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার জন্য দেওয়া হয়েছিল পর পর দু’টি প্রাণঘাতী ইঞ্জেকশন। কিন্তু তাতেও স্তব্ধ হল না হৃদ্স্পন্দন। দিব্যি শ্বাস নিতে দেখা গেল তাঁকে। শেষ পর্যন্ত হাসপাতালে নিয়ে যেতে হল মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত এক বন্দিকে। আমেরিকার টেনেসিতে ঘটে যাওয়া এই ঘটনায় নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার পদ্ধতি নিয়ে।
বন্দির নাম ক্রিস্টা পাইক। ১৯৯৫ সালে মাত্র ১৮ বছর বয়সে এক সহপাঠিনীকে খুন করার ঘটনায় দোষী সাব্যস্ত হন তিনি। দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের পর সম্প্রতি তাঁর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার অনুমতি দেয় আদালত। ১ অক্টোবর টেনেসিতে শুরু হয় সেই প্রক্রিয়া। প্রায় দেড় ঘণ্টার ব্যবধানে ক্রিস্টার শরীরে প্রয়োগ করা হয় দু’টি প্রাণঘাতী ওষুধ। কিন্তু অপ্রত্যাশিত ভাবে তাঁর মৃত্যু হয়নি। স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, ইঞ্জেকশন দেওয়ার পরও ক্রিস্টার শরীরে নড়াচড়া লক্ষ্য করা যায়। তিনি শ্বাসও নিচ্ছিলেন। পরে তাঁর শ্বাসকষ্ট শুরু হয় এবং একটি হাতে শুধু সমস্যা লক্ষ্য করা যায়। পরিস্থিতি দেখে তাঁকে ন্যাশভিলের হাসপাতালে পাঠানো হয়। ঘটনাটি বুঝতে হলে ফিরে যেতে হবে ১৯৯৫ সালে। সে সময় নক্সভিলের একটি কলেজে পড়াশোনা করতেন ক্রিস্টা। তাঁর সঙ্গে কলেজে ছিলেন তাঁর প্রেমিক এবং আরও এক বন্ধু। এক সহপাঠিনীর সঙ্গে ক্রিস্টার প্রেমিকের ঘনিষ্ঠতা তৈরি হতে পারে, এমন আশঙ্কা থেকেই তাঁর মনে গভীর ক্ষোভ তৈরি হয়েছিল। এর পর প্রেমিক ও বন্ধুর সঙ্গে মিলে ওই তরুণীকে খুনের ষড়যন্ত্র রচনা করেন ক্রিস্টা। মাদকের প্রলোভন দেখিয়ে তাঁকে কলেজের একটি নির্জন স্থানে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে তাঁর উপর দীর্ঘ সময় ধরে হামলা চালানো হয়। পরে পাথর দিয়ে মাথায় আঘাত করে তাঁকে হত্যা করা হয়েছিল। তদন্তে আরও জানা যায়, হামলার সময় তাঁর শরীরে ছুরি দিয়ে একটি চিহ্ন এঁকে দেওয়া হয়েছিল।
ঘটনার দেড় দিনের মধ্যেই তিন অভিযুক্তকে গ্রেফতার করে পুলিশ। ক্রিস্টার প্রেমিকের বয়স তখন ১৭ বছর হওয়ায় তাঁর ক্ষেত্রে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়নি। তাঁকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয় এবং পরে প্যারোলের সুযোগ রাখা হয়েছিল। ২০২৫ সালে তাঁর প্যারোলের আবেদনও খারিজ হয়ে যায়। অন্য দিকে, ঘটনার সময় উপস্থিত থাকা তৃতীয় ব্যক্তির বিরুদ্ধে সরাসরি খুনে অংশ নেওয়ার অভিযোগ প্রমাণিত হয়নি। তদন্তে পুলিশকে সহযোগিতা করায় এবং নিজের ভূমিকার কথা স্বীকার করায় পরে তিনি কারাগার থেকে মুক্তি পান। তবে নিয়মিত এক আধিকারিকের কাছে হাজিরা দেওয়ার নির্দেশ ছিল তাঁর উপর। ক্রিস্টার বিরুদ্ধে খুনের পাশাপাশি খুনের ষড়যন্ত্র পরিকল্পনার অভিযোগও আনা হয়েছিল। ১৯৯৬ সালে আদালত তাঁকে মৃত্যুদণ্ড দেয়। প্রাণঘাতী ইঞ্জেকশন অথবা বৈদ্যুতিক চেয়ারে তাঁর সাজা কার্যকর করার কথা বলা হয়েছিল। নিহত তরুণীর পরিবারও আদালতের কাছে মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখার পক্ষে দীর্ঘদিন সওয়াল করেছিল। তবে ক্রিস্টার সাজা নিয়ে শুরু থেকেই বিতর্ক ছিল। মানবাধিকার সংগঠনগুলি মৃত্যুদণ্ডের বদলে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়ার দাবি জানায়। তাঁর আইনজীবীদের দাবি ছিল, কৈশোরে ক্রিস্টা একাধিক যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছিলেন। তাঁর মানসিক অবসাদের ইতিহাসও রয়েছে বলে আদালতে জানানো হয়। আইনজীবীরা আরও যুক্তি দেন, ১৮ বছর বয়সে মস্তিষ্কের বিকাশ পুরোপুরি সম্পন্ন হয় না। তাই সেই বয়সে আবেগ নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতাও বহুক্ষেত্রে প্রভাবিত হতে পারে। এই যুক্তি সামনে রেখে ক্রিস্টার সাজা বদলের জন্য ২২৬ পাতার আবেদনপত্রও জমা দেওয়া হয়েছিল। তবে দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়ার পর আমেরিকার সুপ্রিম কোর্ট মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের পথ পরিষ্কার করে দেয়। এর আগেও কারাগারে ক্রিস্টার বিরুদ্ধে হিংসাত্মক আচরণের অভিযোগ ওঠে একবার। ২০০১ সালে এক সহবন্দির গলায় জুতোর ফিতে পেঁচিয়ে তাঁকে আক্রমণের চেষ্টা করেছিলেন বলে অভিযোগ আনা হয়। এ বার মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের সময় ঘটে গেল আরও একটি নজিরবিহীন ঘটনা। টেনেসির অ্যাটর্নি জেনারেলের দফতর জানিয়েছে, নির্ধারিত নিয়ম মেনেই ওষুধের প্রয়োগ করা হয়েছিল। তবে আইন অনুযায়ী একই প্রক্রিয়ায় ক্রিস্টার শরীরে আর প্রাণঘাতী ইঞ্জেকশন দেওয়া যাবে না। এই ঘটনার পর টেনেসিতে চলতি বছরের বাকি মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের প্রক্রিয়া স্থগিত রাখারও নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ক্রিস্টার পরবর্তী চিকিৎসা এবং তাঁর মৃত্যুদণ্ডের ভবিষ্যৎ কী হবে, এখন সেটিই মূলত দেখার বিষয়।