Calcutta Television Network

বিজ্ঞানে ভরসা, মুম্বাইয়ে চার বছর ধরে ফ্রিজারে বন্দি মৃতদেহ

বিজ্ঞানে ভরসা, মুম্বাইয়ে চার বছর ধরে ফ্রিজারে বন্দি মৃতদেহ
2 October 2026 • 11:32:43 am

মৃত্যুই সত্য আর মৃত্যুই শেষ। তারপরেও আমরা প্রিয়জনের এই চলে যাওয়াকে মেনে নিতে পারি না, বলা ভালো মেনে নিতে চাই না। মন না মানলেও মৃত্যুর পরে প্রিয়জনকে পঞ্চভূতে বিলীন হতে দেখে চোখের কোণ চিক-চিক করে ওঠে। কিন্তু বিজ্ঞান কি পারে এই মৃত্যুর অমোঘ সত্যকে অস্বীকার করতে? মানুষ কি কোনোদিন পারবে হারানো স্বজনকে আবার জীবিত অবস্থায় ফিরে পেতে? সেই উত্তর এখনও কালের গর্ভে। কিন্তু এখনও পর্যন্ত মৃত্যুই যে শেষ বিদায়, সেটা মানতে পারেননি মুম্বাইয়ের মালাডের এক পরিবার। দীর্ঘ চার বছর ধরে মৃত বাবার দেহ ডিপ ফ্রিজারে সংরক্ষণ করে রেখেছিল পরিবার। বিজ্ঞানের ওপর অগাধ ভরসা এবং পুনর্জন্মের প্রতি বিশ্বাসের স্পষ্ট ছবি উঠে এসেছে এই ঘটনার নেপথ্যে।


২০২২ সালের ৯ জুন ক্যান্সারে আক্রান্ত এক বৃদ্ধ হৃদযন্ত্র বিকল হয়ে মারা যান, মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৮০ বছর। চিকিৎসকরাও তাঁর স্বাভাবিক মৃত্যুর কথা ঘোষণা করেন এবং নিয়ম মেনে মৃত্যুর শংসাপত্রও পায় পরিবার। কিন্তু গল্পটা শুরু হয় এখান থেকেই। মৃতের দুই সন্তান,  মেয়ে পেশায় আইনজীবী এবং ছেলে মুম্বাইয়ের বাসিন্দা, বাবার এই চিরবিদায় মানসিক ভাবে মেনে নিতে পারেননি। মৃত বাবাকে ফিরিয়ে আনার জন্য তারা ঠিক করেন যে বিজ্ঞানের সাহায্য নেবেন। 

পরিবারটির বিশ্বাস ছিল, চিকিৎসা বিজ্ঞান যেভাবে দ্রুত এগিয়ে চলেছে, তাতে আগামী দিনে মৃত মানুষকেও বাঁচিয়ে তোলা সম্ভব হতে পারে।  ইন্টারনেটে তাঁরা সন্ধান পান ‘ক্রায়োনিক্স’ (Cryonics) প্রযুক্তির, যেখানে অতি শীতল তাপমাত্রায় মানবদেহ দীর্ঘদিন ধরে সংরক্ষণ করা যায়।  তাঁরা চেয়েছিলেন দেহটি  আমেরিকার একটি বিশেষ ক্রায়োনিক্স সেন্টারে পাঠাতে। আইনি জটিলতার কারণে দেহটি বিদেশে পাঠাতে দেরি হওয়ায়, প্রথমে তাঁরা দেহটি মালাডের নিজের বাড়িতেই ফ্রিজারে সংরক্ষণ করে রেখেছিলেন। পরে আবাসন পুনর্নির্মাণের কারণে, ওই দেহ কুরার এলাকার একটি ডে-কেয়ার সেন্টারে রাখা হয়। চার বছর ধরে দেহটি ওই ডে-কেয়ারেরই রাখা ছিল। কিন্তু সম্প্রতি ওই ডে-কেয়ার সেন্টারটি যে ভবনে অবস্থিত, সেটি পুনর্নির্মাণের কাজ শুরু হয়। ঘরটি দীর্ঘ দেড় মাস ধরে বন্ধ থাকার পর আচমকা সেখান থেকে তীব্র পচা গন্ধ বের হতে শুরু করে। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগের ভিত্তিতে কুরার থানার পুলিশ ঘটনাস্থলে এসে প্রায় কঙ্কালসার হয়ে যাওয়া বৃদ্ধের মৃতদেহ উদ্ধার করে।    

তদন্তকারীরা জানিয়েছেন এই পুরো সময় দেহটি সংরক্ষিত রাখতে  বিপুল অর্থ ব্যয় করেছেন। জানা গেছে, দেহ সংরক্ষণের জন্য রাসায়নিক ও অনান্য রক্ষণাবেক্ষণের জন্য পরিবারটিকে প্রতি মাসে প্রায় ১ লক্ষ ৬০ হাজার টাকা গুনতে হতো, এবং বিগত চার বছরে তাঁরা ৫০ লক্ষ টাকারও বেশি খরচ করে ফেলেছিলেন। যদিও ভারতবর্ষে মৃতদেহ সংরক্ষণ করা যাবে কতদিন সেই বিষয়ে কোনো নির্দিষ্ট আইনি নির্দেশ নেই। কিন্তু অনেক পুরানো দেহ পরিবেশে রোগ ছড়াতে পারে, সেই হিসাবে দেহকে সৎকার করে দেওয়ারই নিয়ম। 

পুলিশি তদন্তে কোনো অপরাধমূলক ষড়যন্ত্র বা অপ্রীতিকর কিছুর প্রমাণ মেলেনি এবং মৃত্যুটি সম্পূর্ণ স্বাভাবিক ছিল। তবে এই ঘটনা সমাজকে এক বড়সড় প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। চিকিৎসাবিজ্ঞানের কোথায়, কোষ বা ভ্রূণ সংরক্ষণ করা সম্ভব হলেও, মৃত মানুষকে ক্রায়োনিক্সের মাধ্যমে বাঁচিয়ে তোলার ধারণাটি এখনও সম্পূর্ণ কাল্পনিক ও পরীক্ষামূলক। আজ অব্দি এরকম কোনো ঘটনা সামনে উঠে আসেনি। তদন্তকারীদের বোঝানোর পরে পরিবারটি অবশেষে ধর্মীয় রীতি মেনে বৃদ্ধের শেষকৃত্য সম্পন্ন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। মৃত্যুর চার বছর পরে বন্ধ ফ্রিজার থেকে পঞ্চভূতে বিলীন হলেন বৃদ্ধ।

×
  • CTVN