স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাসে বহু পুরুষ বিপ্লবীর নাম আমরা জানি, কিন্তু কতজন জানি বাংলার প্রথম মহিলা রাজবন্দীর কথা? তিনি ননীবালা দেবী-এক বাল্যবিধবা নারী, যাঁর শরীর ভাঙতে পেরেছিল ব্রিটিশ অত্যাচার, কিন্তু মন নয়।
১৮৮৮ সালে হাওড়ার বালিতে জন্ম। অল্প বয়সে বিয়ে, ষোলোতেই বিধবা। সমাজের বিধিনিষেধে আটকে থাকা সেই নারীই প্রথম বিশ্বযুদ্ধের অস্থির সময়ে যুগান্তর দলের বিপ্লবীদের সঙ্গে যুক্ত হন। বাঘা যতীন ও রাসবিহারী বসুর বিপ্লবী চেষ্টার পর্বে তিনি গোপনে আশ্রয় দেন পলাতক বিপ্লবীদের, অস্ত্র লুকিয়ে রাখেন, বার্তা পৌঁছে দেন এক কেন্দ্র থেকে অন্য কেন্দ্রে।
সবচেয়ে দুঃসাহসিক কাজ-রামচন্দ্র মজুমদারের স্ত্রী সেজে প্রেসিডেন্সি জেলে প্রবেশ। এক বাঙালি বিধবার সিঁদুর পরে জেলে যাওয়া তখন অকল্পনীয় সাহস। পুলিসের চোখে ধুলো দিয়ে তিনি ‘মাউজার’ পিস্তলের সন্ধান সংগ্রহ করে বেরিয়ে আসেন।
অবশেষে গ্রেপ্তার। কাশী জেলে তাঁর ওপর চলে অমানবিক নির্যাতন-শরীরে লঙ্কাবাটা প্রবেশ করানো, অন্ধকার শাস্তি কুঠুরিতে বন্দি রাখা, অপমানজনক জেরা। তবু তিনি একটিও নাম উচ্চারণ করেননি। পরে কলকাতার প্রেসিডেন্সি জেলে রাজবন্দী হিসেবে বন্দিত্ব। ২১ দিনের অনশন ভেঙে সহবন্দী দুকড়িবালা দেবীর শ্রমদণ্ড লাঘব করান। আই.বি. অফিসে ব্রিটিশ অফিসার গোল্ডির অপমানের জবাবে চড় মারার ঘটনাও তাঁর অদম্য আত্মসম্মানের সাক্ষ্য।
১৯১৯ সালে মুক্তি পেলেও সমাজ তাঁকে গ্রহণ করেনি। বালির বাড়ি ফিরেও ঠাঁই মেলেনি। উত্তর কলকাতার বস্তিতে দারিদ্র্যের মধ্যে জীবন কাটে। স্বাধীনতার পরও তিনি প্রায় বিস্মৃত। ১৯৬৭ সালে তাঁর মৃত্যু-নীরবে।
যে নারী দেশের জন্য বিধবার সামাজিক শৃঙ্খল ভেঙে বিপ্লবের পথে হেঁটেছিলেন, লঙ্কার আগুন সহ্য করেছিলেন, ইতিহাস তাঁকে প্রাপ্য সম্মান দেয়নি। ননীবালা দেবী আজও আমাদের বিবেককে প্রশ্ন করেন-স্বাধীনতার মূল্য কি আমরা সত্যিই জানি?