প্রযুক্তি ও শৃঙ্খলাপরায়ণ জীবনযাত্রার জন্য বিশ্বের কাছে সুপরিচিত জাপান। ইদানিং সময়ে এক অন্য সমস্যায় জর্জরিত। দেশটির বিভিন্ন এলাকায় ভালুকের হামলা বাড়তে থাকায় মানুষ ও বন্যপ্রাণীর সংঘাত বারবার শিরোনামে চলে আসছে। এই পরিস্থিতি সামাল দিতে বিপুল সংখ্যক ভালুক মারার পথে হাঁটছে জাপান সরকার। খানিক নৃশংস মনে হলেও, নিরুপায় হয়ে এই পদক্ষেপ নিয়েছে জাপান সরকার। তবে সরকারের এই পদক্ষেপকে ঘিরে শুরু হয়েছে তীব্র বিতর্ক। সেই বিতর্কের আঁচ ছড়িয়ে পড়েছে কাঁটাতার পেরিয়ে সারা পৃথিবীর বুকে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের এপ্রিল থেকে ২০২৬ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত জাপানে ১৪ হাজারেরও বেশি ভালুক নিধন হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে প্রায় বারো হাজার বাদামি ভালুক এবং দু’হাজার কালো ভালুক। ২০২৬ সালের শুরু থেকেই আরও কয়েক হাজার ভালুক নিধন হয়েছে। ভবিষ্যতেও বিপুল সংখ্যক ভালুক নিধনের পরিকল্পনা রয়েছে বলে সরকারি সূত্রে জানা গিয়েছে। জাপান সরকারের দাবি, মানুষের নিরাপত্তার কথা মাথায় রেখেই এই গুরুতর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। দেশটির বিভিন্ন পার্বত্য ও বনাঞ্চল সংলগ্ন এলাকায় ইতিউতি প্রায়ই লোকালয়ে ঢুকে পড়ছে ভালুক। খাবারের সন্ধানে মানুষের কাছাকাছি চলে আসার পর অনেক ক্ষেত্রেই হিংস্র হামলার ঘটনা ঘটছে। চলতি বছরেও ভালুকের আক্রমণে একাধিক মানুষের মৃত্যু ঘটেছে দেশজুড়ে। বিশেষ করে জাপানের উত্তরাঞ্চলের পার্বত্য এলাকাগুলিতে এই সমস্যা খানিক বেশিই দেখা যায়। গত বছর কয়েকশো মানুষ ভালুকের হামলার শিকার হন এবং বেশ কয়েক জনের মৃত্যুও হয়। চলতি বছরে আক্রমণের সংখ্যা আরও বেড়েছে বলে বিভিন্ন পরিসংখ্যান মারফত উঠে এসেছে। ভালুককে দূরে সরিয়ে দেওয়ার জন্য জাপানে দীর্ঘ দিন ধরেই নানা পদ্ধতির আশ্রয় নেওয়া হয়েছে। প্রশিক্ষিত কুকুর দিয়ে ভালুককে জঙ্গলমুখী করার ব্যবস্থাও রয়েছে। প্রয়োজন হলে চেতনানাশক প্রয়োগ করে প্রাণীগুলিকে গভীর অরণ্যে ফিরিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়।
কিন্তু ভালুক ও মানুষের মুখোমুখি হওয়ার ঘটনা বেড়ে যাওয়ায় এই পদ্ধতিগুলি এখন আর সব ক্ষেত্রে কার্যকর হচ্ছে না। এই পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষও নানা সতর্কতামূলক পদক্ষেপ নিচ্ছেন। কোথাও জমির পাশে ভয় দেখানোর জন্য কৃত্রিম প্রাণীর মূর্তি বসানো হচ্ছে, আবার বিভিন্ন জায়গায় ভালুকের উপস্থিতি সম্পর্কে সতর্কবার্তাও ছড়ানো হচ্ছে। এমনকি ভালুকের হামলায় সম্পত্তির ক্ষতি হলে ক্ষতিপূরণের জন্য বিভিন্ন সংস্থার মাধ্যমে বিশেষ বিমার ব্যবস্থাও শুরু হয়েছে। তবে প্রাণী সংরক্ষণ নিয়ে কাজ করা সংগঠনগুলির একাংশ সরকারের সিদ্ধান্তের বিরোধিতা শুরু করেছে। তাঁদের আশঙ্কা, নির্বিচারে ভালুক মারলে বিশেষ করে এশীয় কালো ভালুকের সংখ্যা দ্রুত কমে যেতে পারে। তাঁদের মতে, বনাঞ্চল কমে যাওয়া ভালুক আক্রমণ বৃদ্ধির মূল কারণ। এছাড়াও খাদ্যের অভাবের কারণেই ভালুক ক্রমশ জনবসতির দিকে চলে আসছে। এই কারণে শুধু ভালুক হত্যা নয়, বন ও বন্যপ্রাণীর বাসস্থান রক্ষা করাও জরুরি বলে মত পরিবেশবিদদের একাংশের। জাপানের পরিবেশ মন্ত্রকও জনবসতির কাছে খাবারের উৎস কমানো, বেড়া দেওয়া এবং মানুষকে সতর্ক করার মতো পরিকল্পনার উপর জোর দেওয়া শুরু করেছে। মানুষের জীবন রক্ষা এবং বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ, এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য কী ভাবে তৈরি করবে জাপান প্রশাসন, সেটিই এখন তাঁদের সম্মুখে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।