আজ দশমী। মায়ের দর্পণ বিসর্জন হয়ে গেছে অনেকক্ষণ। এবার বরণ শেষে উমার ঘরে ফিরে যাওয়ার পালা। চারটে দিন সবাইকে মাতিয়ে রেখে আজ দশমীতে একরাশ অভিমান দিয়ে মা চলে যাবেন কৈলাসে। আবার এক বছরের অপেক্ষা, গোটা একটা বছর তাঁর ফিরে আসার দিন গোনে আপামর বাঙালি। 'সম্বৎসর ব্যতীতে তু পুনরাগমনায় চ'- মন্ত্রে মা-কে ফের আসছে বছর ফিরে আসার আহ্বান জানানো হয়ে গেছে পূজার মাধ্যমেই। কিন্তু মন তো, মানতে কি চায়, তাই আজ বাঙালির চোখের কোণে জল।
গোটা বিশ্বকে যিনি শাসন করেন, পালন করেন, সেই মহামায়া বাঙালির ঘরের মেয়ে। একমাত্র হয়ত বাঙালিরাই পেরেছে ভগবানের সাথে এতটা আত্মিক হতে। কারোর কাছে উমা ঘরের মেয়ে, কারোর কাছে মা আবার কারোর কাছে ঘরের সধবা বৌ। তিনি অসুরদলনী হলেও স্নিগ্ধ, শান্ত, কোমল। 'মা এলে সব কিছু ঠিক হয়ে যাবে' এই আশা নিয়ে বুক বাঁধে কত মানুষ। এই আশা নিয়েই কেউ মরতে চেয়েও মরতে পারেনা, কেউ আরও বেশি খাটাখাটনি করে পূজার কদিন পরিবারের মুখে হাসি ফোঁটাবে বলে। না পাওয়া কতকিছু, রাগ, হতাশা, দুঃখ, সব ওই তাঁর চরণে সঁপে দিয়ে গোটা একটা বছর কত মানুষ কাটিয়ে দেয়। ওই যে তারা জানে, মা আসলেই সব ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু মেয়ে তো ফিরে যাবেই পতিগৃহে। মন মানতে না চাইলেও এটাই সত্যি। নবমীর রাত মন খারাপের রাত আর দশমীর সকাল বিষাদের। উমা ফিরছেন ঘরে। 'সম্বৎসর ব্যতীতে তু পুনরাগমনায় চ'- মন্ত্রপাঠ করতে করতে গলা কেঁপে ওঠে পুরোহিতের, অজান্তেই চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ে। তারপর বরণ, সিঁদুরখেলা, ধুনুচিনাচ, চারদিনের উৎসবের শেষ।
আসলে দুর্গোৎসবের মূল দর্শনই হল 'আবর্তন', যেখানে থাকে সৃষ্টি, স্থিতি ও লয়। মা চলে যাচ্ছেন মানেই সব কিছু শেষ নয় আবার নতুন করে শুরুর অপেক্ষা। আর এই ফিরে আসবেন তিনি এই আশা নিয়েই আবার শুরু হয় নতুন করে পথ চলা। হয়ত উৎসব শেষে বিজয়ার প্রণাম, কোলাকুলি, মিষ্টিমুখ এই বিষাদকে ফিকে করার জন্যই। মা যাত্রা করবেন কৈলাসের উদ্দেশ্যে, ততদিন 'আসছে বছর আবার হবে', ফাটিয়ে হবে, জমিয়ে হবে। আবার মা আসবেন, নতুন করে আলো জ্বলবে, জীবনেও। সকলকে শুভ বিজয়া।