বাংলায় একটা চলিত প্রবাদ আছে 'পুজো পুজো পুজো, পুজো শেষ।' আজ মহানবমী, পঞ্জিকায় অবশ্য দশমী হয়ে গেছে। নবমী পূজা শেষে হোম-ও হয়ে গেছে মণ্ডপে মণ্ডপে। রাত পোহালেই দশমীর পূজা,ঘট নাড়িয়ে দেওয়া হবে, দর্পণে বিসর্জন হবে উমার। মহাদেব এসে ঘরণীকে নিয়ে যাবেন কৈলাসে। বাঙালির তাই আজ মন ভারাক্রান্ত। শেষ দুপুর, বিকাল, সন্ধ্যে বা রাতটা সূয্যিমামা আকাশে উঁকি দিলেই কাল মায়ের বিদায় বেলা উপস্থিত। তাই বাঙালি আজকের দিনটা উপভোগ করে নিতে চায় চেটেপুটে।
‘ওরে নবমী নিশি, না হইও রে অবসান’, কমলাকান্তের শাক্ত পদাবলীর এই লাইনটুকুই বাঙালির প্রাণের উৎসবের শেষলগ্নে এসে আকুল প্রার্থনা হয়ে ওঠে। শরৎকালের নীল আকাশ, শিউলির গন্ধ, কাশবনের দোলা আর ঢাকের আওয়াজে যে আনন্দের জোয়ার আসে, নবমীর রাতে যেন সব কিছু স্তিমিত হয়। মন ভারাক্রান্ত, সাথে এক বুক যন্ত্রণা। মহাসপ্তমী আর মহাঅষ্টমীর ঢাকের আওয়াজ, আরতি আর আলোর রোশনাই পেরিয়ে যখন নবমী নিশি আগত, হঠাৎ-ই আনন্দের মাঝেও বেজে ওঠে বিদায়ের সুর। বাঙালির আছে দেবী দুর্গা শুধুই ভগবান না, তিনি ঘরের মেয়ে, সবার আপন উমা। 'আশ্বিন মাসে বাপের বাড়ি আসেন ভগবতী' তারপরে চারটে দিন, আবার গিরিরাজের কন্যা ফিরে যায় পতিগৃহে। এই চারটে দিন মা মেনকার মতই গোটা বাংলার মানুষ উমাকে আগলে রাখে। কিন্তু নবমীর রাত ফুরোলেই আসবে দশমী, উমাকে চলে যেতে হবে। যেন নবমী তিথির কাছেই আকুল স্বরে বলা হচ্ছে, "ওরে নবমী নিশি, না হইও রে অবসান..."
নবমীর শেষ বেলায় আলোকোজ্জ্বল মণ্ডপগুলো যেন বলে ওঠে 'সময়টা এখানেই থমকে যাক!' রাত বাড়ার সাথে সাথে ঢাকের বোলেও যেন করুণ সুর বাজতে থাকে। উৎসবের আনন্দকে আর একটুখানি উপভোগ করে নেওয়ার চেষ্টা চলে আপামর বাঙালির। ‘নবমী নিশি’ ভালোবাসার মানুষকে ধরে রাখার আকুলতা। সে চলে যাবে জেনেও জেনেও আরও কিছুটা সময় তাকে নিজের কাছে রেখে দেওয়ার চেষ্টা । কিন্তু নবমী নিশি শেষ হয়ে বিজয়ার আলো ফুটবেই, উমা বিদায় নেবে, মন খারাপ নিয়েই বাঙালি আবার একটা বছরের জন্য প্রতীক্ষার প্রহর গুনতে শুরু করে।