পাঁচ বছরের ছোট্ট আয়েশা, পূজার কটা দিন বড় রাস্তা ছেড়ে, গলির একটু ভিতরে গিয়ে আস্তানা গাড়ে। হ্যাঁ, ওরা ফুটপাথের পাকাপাকি বাসিন্দা। সামনের মাঠের পূজাটা বেশ বড় হয়, ভিড় বাড়ে, তাই ওদেরও এই কটাদিনের জন্য আস্তানা বদলাতে হয়। প্রতি বছরের গল্প এটা, মা চারদিনের জন্য মর্তে আসেন আর ওরাও সংসার নিয়ে অন্য জায়গায় আস্তানা গড়ে কটাদিন। দশমীর সিঁদুর খেলা হয়, বিসর্জনের ঢাক বাজে, আয়েশারা ঘরে ফিরে যায়। পূজা প্রতিবছর আসে, অনেক স্মৃতি, আনন্দ রেখে দিয়ে আবার চলে যায়। এই চারটে দিন চারিপাশে নতুন জামার গন্ধ, আলো, খাওয়াদাওয়া আর মণ্ডপে মণ্ডপে মানুষের উপচে পড়া ভিড়। কিন্তু, ওই কথায় আছে না, প্রদীপের নিচেই অন্ধকার, জমকালো এই উৎসবের ঠিক সমান্তরালেই থেকে যায় আরেকটি ধূসর জগৎ। আয়েশার মত আরও অনেক ফুটপাথে বড় হওয়া পথশিশুদের কাছে এই উৎসব 'রিয়েলিটি চেক'-এর মত হয়ে থাকে।
যে বয়সে অন্য শিশুরা বাবা-মায়ের হাত ধরে মণ্ডপে ঘুরে বেড়ায়, নতুন পোশাকে ছবি তোলে, সেই বয়সে ওদের লড়াইটা থাকে দুমুঠো অন্নের জন্য। উৎসবের দিনগুলোতে বড় বড় রেস্তোরাঁ আর মণ্ডপের বাইরে ওরা ভিড় জমায়। কেউ কেউ প্লাস্টিকের খেলনা বা বেলুন বিক্রি করে, কেউ আবার গাড়ির কাচ মুছে দু-পাঁচ টাকা পাওয়ার আশায় ছুটে চলে, আবার কেউ মণ্ডপের আবর্জনার স্তূপ থেকে প্লাস্টিকের বোতল কুড়ায়। পূজায় ওরা আশা করে থাকে একটা নতুন জামার। দূর থেকে মণ্ডপের আলো আর ঝলমলে প্রতিমা দেখে তারা আনন্দ খোঁজার চেষ্টা করে। কোনো কোনো হৃদয়বান মানুষ বা স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন হয়তো তাদের হাতে নতুন পোশাক বা ভালো খাবার তুলে দেয়। কিন্তু সেই ক্ষণিক আনন্দ উৎসবের চার দিন পার হতেই ফিকে হয়ে যায়। আলোর উৎসব শেষ হলে মণ্ডপগুলো যখন অন্ধকার হয়ে যায়, ওরাও দিন কাটায় অন্ধকার ফুটপাথেই।
দুর্গাপূজা, আসুরিক শক্তির বিরুদ্ধে শুভ শক্তির জয়ের উৎসব। আয়েশাদের শিশুমনে প্রশ্ন থেকেই যায়, 'মা, আমরা কেন ভালো নেই?', উমার বিদায়ে যখন সবার চোখে জল, উমার চোখেও হয়ত জল আসে আয়েশাদের জন্য। কোথাও মনে হয়ে সমাজের এই সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের জীবনের অন্ধকার দূর না হলে উৎসবের প্রকৃত আলো কি আদৌ সম্পূর্ণ হয়? হয়ত উমা বন্দনা তখনই সার্থক হবে, যখন মণ্ডপের আলো এই পথশিশুদের মলিন মুখেও একটু স্থায়ী হাসির রেখা ফুটিয়ে যেতে পারবে।