আজ দশমী। এবার বরণ শেষে উমার ঘরে ফিরে যাওয়ার পালা। চারটে দিন সবাইকে মাতিয়ে রেখে আজ দশমীতে একরাশ অভিমান দিয়ে মা চলে যাবেন কৈলাসে। আবার এক বছরের অপেক্ষা, গোটা একটা বছর তাঁর ফিরে আসার দিন গোনে আপামর বাঙালি। শেষ হল বাঙালির শ্রেষ্ঠ উৎসব দুর্গাপূজা। আর এই উৎসবের প্রাণ ঢাকের আওয়াজ। মহালয়ার ভোর থেকে শুরু করে বিজয়া দশমী পর্যন্ত ভাসানের আগে অব্দি ঢাকের বোল ছাড়া উৎসব পূর্ণতা পায়না। কিন্তু যে ঢাকিরা নিজের হাতের জাদুতে গোটা উৎসব মাতিয়ে রাখেন, সেই উৎসবের আলো নিভে যাওয়ার পর তারা কেমন থাকেন? দশমীর সিঁদুরখেলা আর বিসর্জন শেষ হতেই ওরাও ঘরে ফেরে হয়ত একরাশ অভিমান নিয়েই।
উত্তর শহরতলির পূজা মণ্ডপের একদল ঢাকি বর্ধমান থেকে এসেছেন। দশমী পূজার শেষে বাড়ি বাড়ি বেরিয়েছেন জামাকাপড় আর বকশিস নিতে। ঝোলা মোটামুটি ভরে গিয়েছে নতুন আর পুরানো জামায়। চোখেমুখে বেশ একটা প্রশান্তি। বিড়িতে টান দিয়ে হাসতে হাসতে বললেন, 'এই তো এবার ফিরে যাবো, যা পেলাম তাতে এবার মন ভরে গেছে। প্রতিবারই এলে বড্ড আনন্দ পাই। আসলে ঢাকটাকে ভালোবাসি তো।' এমনিতে পূজার দিনগুলো ক্লাব কর্তৃপক্ষ ওদের বেশ যত্নেই রাখে। খাওয়াদাওয়া, নতুন জামাকাপড় সব কিছুই থাকে। হ্যাঁ বকশিস নিয়ে কখনো উপর-নিচ হলেও সে পুষিয়ে যায়। কিন্তু দশমীর সিঁদুরখেলা আর প্রতিমা নিরঞ্জনের পরেই উৎসব শেষ। অন্ধকার মণ্ডপে ঠাকুর বেদীতে শুধু একটা প্রদীপ জ্বলে। ঢাকিরাও ঢাকটি কাপড়ে মুড়ে রওনা দেন বাড়ির উদ্দেশ্যে।
তবে সব কিছু ঠিক থাকলেও ওদের বাড়ি ফিরে যাওয়াটা কিন্তু অনিশ্চয়তার দিকেই। ওদের প্রায় প্রত্যেকেরই ঠিকানা পশ্চিমবঙ্গের প্রত্যন্ত গ্রামগুলো, মুর্শিদাবাদ, বীরভূম, বাঁকুড়া বা পুরুলিয়া। পেশায় তারা মূলত ভাগচাষী বা দিনমজুর। ঢাক বাজানো তাদের বংশানুক্রমিক পেশা হলেও, এটি বছরের মাত্র কয়েকটা দিনের জীবিকা। পূজার সময় পাওয়া এই পারিশ্রমিক নিয়ে তারা ফিরে যান তাদের ঘরে। তা দিয়ে গোটা বছর চালানো অসম্ভব। মুর্শিদাবাদ থেকে আসা এক ঢাকির কথায়, 'ছোট বাচ্চাগুলোর জন্য জামাকাপড় নিয়ে যাই বাবু। রেশনে ধার, ওষুধের দোকানে ধার, সব মিটাতেই এই টাকা শেষ।' উৎসবের আলো যাদের হাত ধরে আসে, উৎসব শেষে তারাই বোধহয় আবার ফিরে যান অন্ধকারের বৃত্তে। দূর কৈলাস থেকে উমা হয়ত কপালে হাত ঠেকিয়ে বলেন, 'সাবধানে যাস, দুগ্গা দুগ্গা।'