দুর্গোৎসব শেষ, মা ফিরে গেছেন পতিগৃহে। আবার অপেক্ষা এক বছরের। কিন্তু মর্তের দুর্গারা থেকে যান আমাদের মধ্যেই, উমা ফিরে গেলেও তাঁরা থেকে যান দুহাত দিয়েই দশদিক আগলানোর জন্য। সেই 'দুর্গা'দের জীবন যে সবসময় সুন্দর সাজানো হয় তা নয়, কিন্তু তাঁদের এই সংগ্ৰামই হাতিয়ার হয়ে উঠেছে বারবার। মহারাষ্ট্রের ওয়ার্ধা জেলায় ১৮৪৮ সালে জন্ম নেন সিন্ধুতাই সাপকাল, অবাঞ্চিত এক কন্যা হয়ে থেকেছেন তিনি গোটা শিশুকাল। নাম হয়েছিল 'চিন্দি', শ্রীহরি সাপকালের সাথে যখন তাঁর বিয়ে হয়, চিন্দির বয়স মাত্র বারো তখন। পিতা অভিমানজি সাঠে চেয়েছিলেন মেয়ে পড়াশুনা করে বড় হোক। কিন্তু সিন্ধুতাই-এর মা বা সমাজের অনেকেই চাননি একটা মেয়ে পড়াশুনা করুক। তারপরেই অভিমানজি মেয়েকে সামনের স্কুলে পাঠাতেন, সেখানেই তাঁর প্রাথমিক শিক্ষা হয়েছিল।
২০ বছর বয়সে যখন তিনি গর্ভবতী, সেই সময় এক প্রভাবশালীর অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেন সিন্ধু। সেই প্রভাবশালী শ্রীহরিকে প্ররোচনা দিয়ে একপ্রকার মিথ্যে অপবাদে সিন্ধুকে ঘর ছাড়া করেন, তখন তিনি ৯ মাসের গর্ভবতী। তিনি একটা গোয়ালঘরেই জন্ম দেন এক কন্যাসন্তানের। আশ্রয়হীন, অনাহারে সিন্ধু শুরু করে রেলস্টেশনে ভিক্ষাবৃত্তি। দু-একবার আত্মহত্যার সিদ্ধান্ত নিলেও মেয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে সেটা করতে পারেননি তিনি। তিনি আরও দেখলেন তাঁর মত অনেকেই ভিক্ষাবৃত্তি করে চলেছেন দুটো খাবারের জন্য। আর তিনি তখনই সিদ্ধান্ত নেন সেইসব অনাথ বাচ্চাদের জন্য তিনি নিজেই ঢাল হয়ে দাঁড়াবেন। ভাবা যতটা সহজ ছিল করা সহজ ছিল না। ভিক্ষার টাকা দিয়েই তিনি অল্প অল্প করে শুরু করেন অনাথদের দায়িত্ব নেওয়া। নিজের মেয়ে মমতাকেও এক ট্রাস্টের হাতে তুলে দেন,যেখানে সঠিক শিক্ষা ও থাকা-খাবারের সবরকম ব্যবস্থা রয়েছে। অবশ্য পরে মমতা মায়ের মতই বাচ্চাদের দায়িত্ব নেন।
(মেয়ে মমতার সাথে সিন্ধুতাই)
নিজের উপার্জন দিয়েই একটি অনাথ আশ্রম তৈরী করেন তিনি। তারপর থেকে ওখানেই ঠিকানা হয়েছে প্রায় ১৪০০ অনাথের। তিনি শুধু তাদের আশ্রয়ই দেননি, প্রত্যেককেই করেছেন উচ্চশিক্ষিত। কেউ ডক্টরেট, ইঞ্জিনিয়ার বা আইনজীবী হয়ে আজ প্রত্যেকেই প্রতিষ্ঠিত। ১০৫০ এর বেশি শিশুদের দত্তক নিয়ে তিনি হয়ে ওঠেন সকলের 'মাই', সকলের মা। এরপর তিনি রাস্তায় থাকা অনাথ কিশোরী ও নাবালিকাদের জন্য তৈরী করেন 'সাবিত্রীবাই ফুলে গালর্স হস্টেল'। এটি ছিল তাঁর প্রথম স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন। জীবদ্দশায় তিনি অনেক পুরস্কার পেয়েছেন। ২০২১ সালে ভারত সরকার তাকে পদ্মশ্রী সম্মানে ভূষিত করেন। সিন্ধুতাই মাতৃত্বকে শুধু গর্ভেই সীমাবদ্ধ রাখেননি, তিনি হয়ে উঠেছিলেন সবার মা, প্রত্যেকটি অনাথের মাই।