এক বোতল গঙ্গা জল, যার দাম মাত্র কয়েকটা টাকা, কলকাতা বা তার পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে যে জল বিনা পয়সায়-ই পাওয়া যায়। কিন্তু জানেন কি, এই ফ্রি-র গঙ্গাজল বিক্রি করে কোটিপতি হয়েছিলেন কলকাতার এক ব্যবসায়ী। বৈষ্ণবচরণ শেঠ, জনার্দন শেঠের পুত্র, মুকুন্দরামের বংশধর। তারা ছিলেন অষ্টাদশ শতকের কলকাতার, বিখ্যাত ধনী ব্যবসায়ী পরিবার। বৈষ্ণবচরণের হাত ধরে এমন এক ব্যবসা, যা পরে ছড়িয়ে পড়েছিল গোটা ভারতে। মাটির হাড়ি থেকে শুরু হওয়া এই গঙ্গাজলের ব্যবসা,আজ ইন্ডিয়ান পোস্টের মাধ্যমে পৌঁছে যাচ্ছে লক্ষ মানুষের ঘরে ঘরে। চলুন জেনে নেই, এক সফল ব্যবসার ইতিহাস।
গঙ্গা শুধু একটা নদী নয়, হিন্দু ধর্মাবলম্বী মানুষের কাছে গঙ্গা দেবী, মা। হিন্দুদের সব শুভ কাজেই গঙ্গা জলের ব্যবহার হয়। কিন্তু গঙ্গা পূর্ব বাহিনী নদী, গোমুখ থেকে উৎপত্তি হওয়া এই নদী পূর্বে বাহিত হয়ে বঙ্গোপসাগরে এসে মিশেছে। ফলে পশ্চিম ভারত ও দক্ষিণ ভারতে গঙ্গাজল অপ্রতুল। আর ঠিক এই চাহিদাকেই হাতিয়ার করে বৈষ্ণবচরণ শুরু করলেন গঙ্গাজলের ব্যবসা। তিনি গঙ্গাজল সংগ্রহ করে, মাটির হাঁড়িতে কাপড় দিয়ে মুখ বন্ধ করে পাঠাতে শুরু করলেন, দক্ষিণ ভারত, রাজস্থান, গুজরাটে। শুধু তাই নয়, ব্রিটিশ আদালতে বাদী-বিবাদী হিন্দুদের শপথ নেওয়ার ক্ষেত্রেও গঙ্গাজল ব্যবহার করা হত, সেখানেও পৌঁছে যেতে লাগলো 'বৈষ্ণব চরণ শেঠ'-সিলমোহর লাগানো গঙ্গাজলের হাঁড়ি।
বৈষ্ণবচরণ তাঁর পাটোয়ারি বুদ্ধি কাজে লাগিয়ে শুরু করেছিলেন এই "ডিমান্ড অ্যান্ড সাপ্লাই"-এর চেন। শোনা যায়, সূদুর তেলেঙ্গানার রাজাও নাকি এই বৈষ্ণবচরণের গঙ্গাজলই ব্যবহার করতেন। ১৯০২ সালে জয়পুরের রাজা দ্বিতীয় মাধো সিংয়ের লন্ডন যাত্রার সময়, রুপোর সুবিশাল গঙ্গাজলিতে, গঙ্গাজল পাঠিয়েছিলেন শেঠ মহাশয়। কিন্তু ব্যবসা বৃদ্ধি পেতেই শুরু হলো প্রতিদ্বন্দ্বিতা, কলকাতারই আরেক ব্যবসায়ী চন্ডীপ্রসাদ টেক্কা দিতে শুরু করলেন বৈষ্ণবচরণকে। কিন্তু বেশি দিন চললো না সে ব্যবসা, চন্ডীপ্রসাদের পাত্রে পাওয়া গেলো ব্যাঙ, প্রশ্ন উঠলো বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে। আর ঘটনার পর শেঠ বৈষ্ণবচরণ হলেন আরও সফল।
গোটা ভারতে যখন গঙ্গাজলের চাহিদা তুঙ্গে, এই ব্যবসায় যুক্ত হলেন বৈষ্ণবচরণের কাছের মানুষ নীলমণি ঠাকুর, যিনি জোড়াসাঁকো ঠাকুর পরিবারের অন্যতম পূর্বপুরুষ। শোনা যায় অধুনা জোড়াসাঁকোর ঠাকুর বাড়িটি নীলমণি ঠাকুরকে দান করেছিলেন তিনি। নীলমণি ঠাকুর খেয়াল করলেন, মাটির হাঁড়ি ভেঙে যাওয়ার প্রবণতা অনেক বেশি। দূরদূরান্তে যাওয়ার সময় এই পাত্র হয় ভেঙে যায় নইলে কাপড়ের ঢাকনা খুলে যায়। তিনি শুরু করলেন, টিনের পাত্রে মুখ সিল করে গঙ্গাজল বিক্রি। কোনও ঝামেলা ছাড়াই গঙ্গাজল পৌঁছে যেতে শুরু করলো গোটা দেশ এমনকি বিদেশেও। মাটির হাড়ি থেকে টিনের ক্যান, এটাই ছিল সম্ভবত ভারতের প্রথম প্যাকেজিং ইনোভেশন।
সময় বদলেছে,বদলেছে প্রযুক্তি। ১৯৯০ সাল থেকে বিক্রি শুরু হয় বোতল জাত গঙ্গাজল। ২০১৬ সালে ইন্ডিয়া পোস্ট নিজের উদ্যোগে, গঙ্গোত্রী থেকে আনা গঙ্গা জল পৌঁছে দেওয়া শুরু করে লক্ষ লক্ষ ভারতবাসীর কাছে। আজ অনলাইনের যুগে মোবাইলের এক ক্লিকে গঙ্গাজল পৌঁছে যায় ঘরে ঘরে। গঙ্গা নদী একটা বিশ্বাস, যুগ যুগ ধরে গঙ্গা দেবী বয়ে চলেছেন,তাঁর দু-পাড়ের ইতিহাস আর সংস্কৃতি-কে সঙ্গে নিয়ে। আর এই জল, সৃষ্টি করে গিয়েছিলো সফল এক ব্যবসার, যা ভারতের ব্যবসার ইতিহাস-কে আরও সমৃদ্ধ করে।